বিষয়বস্তু: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ ও উনিশ শতকের শুরুতে বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। এই আলোচনায় সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০) এবং বাংলায় ওয়াহাবী-ফরায়েজী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ সংক্ষিপ্ত বিবরণের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।
১. সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০)
- সংক্ষিপ্ত আলোচনা: সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ আন্দোলন। এই বিদ্রোহ মূলত ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, মজনু শাহের মতো নেতাদের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল। সন্ন্যাসী ও ফকিররা ছিলেন মূলত ভবঘুরে ধর্মীয় mendicant, যারা তীর্থযাত্রা ও ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কোম্পানির অর্থনৈতিক নীতি ও শাসনের ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হলে তারা বিদ্রোহে শামিল হন।
- বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ:
- যৌথ অংশগ্রহণ: এই বিদ্রোহের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল হিন্দু সন্ন্যাসী ও মুসলিম ফকিরদের যৌথভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা।
- অর্থনৈতিক কারণ: কোম্পানির ভূমি রাজস্ব নীতি ও অর্থনৈতিক শোষণ এই বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। তীর্থযাত্রীদের উপর কর আরোপ এবং তাদের স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
- বিস্তৃত অঞ্চল: এই বিদ্রোহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন – রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বগুড়া প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল।
- গেরিলা যুদ্ধ: বিদ্রোহীরা কোম্পানির সৈন্যদের বিরুদ্ধে গেরিলা tactics ব্যবহার করতেন।
- নেতৃত্ব: ভবানী পাঠক, দেবী চৌধুরানী, মজনু শাহ, চিরাগ আলী প্রমুখ এই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। দেবী চৌধুরানীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- অসাম্প্রদায়িক চেতনা: হিন্দু ও মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরিচয় দেয়।
- সীমিত লক্ষ্য: এই বিদ্রোহের প্রধান লক্ষ্য ছিল কোম্পানির শোষণ ও অত্যাচারের অবসান ঘটানো এবং নিজেদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুনরুদ্ধার করা, যদিও এটি ঔপনিবেশিক শাসন উৎখাতের লক্ষ্যে পরিচালিত হয়নি।
- সাহিত্যিক প্রতিফলন: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ ও ‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসে এই বিদ্রোহের চিত্র অমর হয়ে আছে।
২. বাংলায় ওয়াহাবী-ফরায়েজী আন্দোলন
- সংক্ষিপ্ত আলোচনা: উনিশ শতকে বাংলায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সমাজ সংস্কার আন্দোলন দেখা যায় – ওয়াহাবী আন্দোলন ও ফরায়েজী আন্দোলন। যদিও উভয়ের উৎস এবং প্রাথমিক লক্ষ্য ভিন্ন ছিল, বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের প্রেক্ষাপটে তাদের কিছু বৈশিষ্ট্য একত্রিত হয়েছিল।
- ওয়াহাবী আন্দোলন: সৈয়দ আহমেদ বেরলভী কর্তৃক প্রবর্তিত এই আন্দোলন ছিল মূলত ইসলাম ধর্মের শুদ্ধিকরণ আন্দোলন। এর অনুসারীরা ইসলামে প্রচলিত কুসংস্কার ও অ-ইসলামিক রীতিনীতি দূর করে বিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। বাংলায় তিতুমীর এই আন্দোলনের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।
- ফরায়েজী আন্দোলন: হাজী শরীয়তুল্লাহ কর্তৃক প্রবর্তিত ফরায়েজী আন্দোলনও ছিল বাংলায় মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের লক্ষ্যে পরিচালিত একটি আন্দোলন। ‘ফরায়েজ’ শব্দের অর্থ হল অবশ্যকর্তব্য। এই আন্দোলনের অনুসারীরা ইসলামের অবশ্যকর্তব্যগুলি পালনের উপর জোর দিতেন এবং অ-ইসলামিক প্রথা বর্জনের কথা বলতেন।
- বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ:
- ধর্মীয় সংস্কার: উভয় আন্দোলনই মুসলিম সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় কুসংস্কার ও ভেদাভেদ দূর করে বিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপর জোর দেয়।
- সামাজিক প্রতিবাদ: ফরায়েজী আন্দোলন বিশেষত বাংলার কৃষক সমাজের স্বার্থ রক্ষা এবং জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। হাজী শরীয়তুল্লাহর পুত্র দুদু মিয়া এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
- কৃষক আন্দোলন: ফরায়েজী আন্দোলন বাংলার মুসলমান কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী কৃষক আন্দোলনে পরিণত হয়।
- রাজনৈতিক মাত্রা: যদিও প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন ছিল, বাংলায় এই আন্দোলনগুলির একটি রাজনৈতিক মাত্রা লাভ করে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের রূপ নেয়। তিতুমীরের নেতৃত্বে ওয়াহাবীদের সশস্ত্র বিদ্রোহ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
- জনপ্রিয়তা: এই আন্দোলনগুলি বাংলার মুসলিম কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
- সীমিত সাফল্য: শক্তিশালী ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনগুলি শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি, কিন্তু এগুলি বাংলার জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রতিরোধের চেতনা জাগিয়ে তোলে।
সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ এবং বাংলায় ওয়াহাবী-ফরায়েজী আন্দোলন উভয়েই ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ আন্দোলন। অর্থনৈতিক শোষণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনগুলি বাংলার জনগণের সংগ্রামী চেতনা ও ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধের পরিচয় বহন করে। যদিও তাদের লক্ষ্য ও প্রকৃতি ভিন্ন ছিল, উভয় আন্দোলনই ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল এবং পরবর্তীকালের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।