ভূমিকা
বংশগতিবিদ্যা (Heredity) হল এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বৈশিষ্ট্যগুলি এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। গ্রেগর জোহান মেন্ডেল (Gregor Johann Mendel), যিনি “আধুনিক জেনেটিক্সের জনক” নামে পরিচিত, মটর গাছ (Pisum sativum) নিয়ে গবেষণা করেন এবং বংশগতির মূলনীতিগুলি আবিষ্কার করেন। এই প্রবন্ধে আমরা মেন্ডেলের মনোহাইব্রিড ক্রস পরীক্ষা এবং তার সূত্রসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
মেন্ডেলের মনোহাইব্রিড ক্রস পরীক্ষা
একটি মনোহাইব্রিড ক্রস হল এমন একটি জেনেটিক ক্রস যেখানে দুটি পিতৃগাছ মাত্র একটি বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে পার্থক্যযুক্ত হয়। মেন্ডেল তার পরীক্ষার জন্য মটর গাছ নির্বাচন করেন, কারণ:
- এতে বিরোধী বৈশিষ্ট্য ছিল (যেমন, লম্বা বনাম বামন, মসৃণ বনাম কুঁচকানো বীজ)।
- এটি স্বল্প জীবনচক্রের এবং প্রচুর বীজ উৎপন্ন করে।
- এটি স্ব-পরাগায়ন (Self-Pollination) ও পর-পরাগায়ন (Cross-Pollination) করা সহজ।
মেন্ডেলের পরীক্ষার ধাপসমূহ
মেন্ডেল মটর গাছের উচ্চতা (Plant Height) নিয়ে পরীক্ষা করেন। তার গবেষণার ধাপগুলি নিম্নরূপ:
১. মূল পিতৃগাছ নির্বাচন (P Generation)
- তিনি বিশুদ্ধ লম্বা (TT) গাছ এবং বিশুদ্ধ বামন (tt) গাছ বেছে নেন।
- এই দুটি গাছকে পর-পরাগায়নের মাধ্যমে সংকরায়িত করা হয়।
২. প্রথম প্রজন্ম (F₁ Generation) সৃষ্টি
- F₁ প্রজন্মের সব গাছ লম্বা (Tt) হয়।
- এতে বোঝা যায় যে লম্বা বৈশিষ্ট্যটি (T) আধিপত্যশীল (Dominant) এবং বামন বৈশিষ্ট্য (t) গোপন (Recessive)।
৩. F₁ প্রজন্মের স্ব-পরাগায়ন
- মেন্ডেল F₁ প্রজন্মের গাছগুলোকে নিজেদের মধ্যে স্ব-পরাগায়নের সুযোগ দেন।
৪. দ্বিতীয় প্রজন্ম (F₂ Generation) সৃষ্টি
- ফলস্বরূপ, F₂ প্রজন্মে ৩:১ অনুপাতে লম্বা ও বামন গাছ দেখা যায়।
- ৭৫% (৩টির মধ্যে ৩টি) লম্বা (TT বা Tt), এবং ২৫% (১টি) বামন (tt) হয়।
মনোহাইব্রিড ক্রসের পুন্নেট স্কোয়ার (Punnett Square)
মেন্ডেলের পরীক্ষার ফলাফল নিম্নলিখিত ছকে দেখানো হয়েছে:
| পিতৃ উদ্ভিদের জিন (Alleles) | T (লম্বা) | t (বামন) |
| T (লম্বা) | TT (লম্বা) | Tt (লম্বা) |
| t (বামন) | Tt (লম্বা) | tt (বামন) |
- জেনোটাইপিক অনুপাত: ১ (TT) : ২ (Tt) : ১ (tt)
- ফেনোটাইপিক অনুপাত: ৩ লম্বা : ১ বামন
মেন্ডেলের বংশগতির সূত্র
তার গবেষণার ভিত্তিতে, মেন্ডেল তিনটি মূল সূত্র প্রণয়ন করেন:
১. আধিপত্যের সূত্র (Law of Dominance)
- বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে, একটি বৈশিষ্ট্য (Dominant) প্রকাশ পায়, অন্যটি (Recessive) লুকিয়ে থাকে।
- উদাহরণ: F₁ প্রজন্মে সমস্ত গাছ লম্বা (Tt) হয়, কারণ লম্বা বৈশিষ্ট্যটি (T) আধিপত্যশীল।
২. বিভাজনের সূত্র (Law of Segregation)
- জিনের দুইটি অ্যালিল (Allele) পৃথক হয়ে যায় এবং প্রতিটি গ্যামেটে মাত্র একটি অ্যালিল থাকে।
- এটি ব্যাখ্যা করে যে F₂ প্রজন্মে আবার বামন গাছ (tt) দেখা যায়।
৩. স্বতন্ত্র সমাবেশের সূত্র (Law of Independent Assortment)
- এই সূত্র অনুযায়ী, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য একে অপরের থেকে স্বাধীনভাবে বংশগত হয়। তবে এটি শুধুমাত্র ডাইহাইব্রিড ক্রসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, মনোহাইব্রিড ক্রসের ক্ষেত্রে নয়।
উপসংহার
মেন্ডেলের মনোহাইব্রিড ক্রস পরীক্ষা বংশগতির মূলনীতি ব্যাখ্যা করতে সহায়ক। তার গবেষণা আধুনিক জেনেটিক্সের ভিত্তি স্থাপন করেছে। আধিপত্যের সূত্র এবং বিভাজনের সূত্র বর্ণনা করে কীভাবে বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। বর্তমানে জেনেটিক্স চর্চার ক্ষেত্রে মেন্ডেলের সূত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মূল বক্তব্য
✔ মেন্ডেল মটর গাছ নিয়ে বংশগতির গবেষণা করেন।
✔ মনোহাইব্রিড ক্রসের মাধ্যমে একটি বৈশিষ্ট্যের বংশগতি বোঝানো হয়।
✔ F₁ প্রজন্মে শুধুমাত্র আধিপত্যশীল বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়।
✔ F₂ প্রজন্মে ৩:১ অনুপাতে লম্বা ও বামন গাছ দেখা যায়।
✔ মেন্ডেলের সূত্র আধুনিক জেনেটিক্সের ভিত্তি গঠন করেছে।