বিশ শতকের ভারতে ছাত্র আন্দোলনের চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

বিশ শতকের ছাত্র আন্দোলনগুলি আদর্শবাদ, দেশপ্রেম ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার এক শক্তিশালী মিশ্রণ দ্বারা চিহ্নিত ছিল। এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:

  • আদর্শবাদ ও দেশপ্রেম: তরুণ ছাত্ররা প্রায়শই প্রবল আদর্শবাদ ও দেশপ্রেমের भावना দ্বারা চালিত হত এবং জাতীয় মুক্তির ডাকে সাড়া দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকত।
  • সামাজিক সমালোচনা: ছাত্ররা প্রায়শই বিদ্যমান সামাজিক নিয়ম ও ঔপনিবেশিক শাসনের অবিচারের সমালোচনা করত এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার স্পষ্ট সমালোচক হয়ে উঠত।
  • সাংগঠনিক ক্ষমতা: ছাত্ররা তাদের কার্যক্রম সংগঠিত ও সমন্বিত করার জন্য নিজস্ব সংগঠন ও নেটওয়ার্ক তৈরি করত।
  • সক্রিয় অংশগ্রহণ: তারা বিক্ষোভ, শোভাযাত্রা, ধর্মঘট ও বয়কটের মতো কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিত এবং প্রায়শই তাদের কার্যকলাপের জন্য কঠোর পরিণতির শিকার হত।
  • জাতীয় আন্দোলনের সাথে সংযোগ: ছাত্র আন্দোলন বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল, গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন প্রদান করত এবং প্রায়শই স্থানীয় আন্দোলনের সূচনা করত।
  • বিচিত্র মতাদর্শ: জাতীয়তাবাদ একটি unifying factor হলেও, ছাত্ররা গান্ধীবাদ, সমাজতন্ত্র ও বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের মতো বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
  • ত্যাগ ও উৎসর্গ: বহু ছাত্র স্বাধীনতার জন্য তাদের শিক্ষা এবং এমনকি তাদের জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা করেনি।

ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র আন্দোলনের পর্যালোচনা

বিশ শতকের প্রধান ঔপনিবেশিক বিরোধী আন্দোলনগুলিতে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল:

১. বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন (১৯০৫-১৯১১)

  • প্রাথমিক রাজনৈতিক জাগরণ: বঙ্গভঙ্গ ছাত্রদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, যা তাদের সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রাথমিক পর্যায় চিহ্নিত করে।
  • ছাত্র সংগঠনের গঠন: অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটির মতো সংগঠন বিশেষভাবে বঙ্গভঙ্গ ও ছাত্রদের প্রতিবাদ দমনের সরকারি প্রচেষ্টার (ছাত্রদের অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সার্কুলার জারি) বিরুদ্ধে ছাত্রদের সংগঠিত করেছিল।
  • বয়কট ও স্বদেশী: ছাত্ররা বিদেশি পণ্য বয়কট ও স্বদেশী পণ্যের প্রচারে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।
  • গণ বিক্ষোভ: তারা বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে অসংখ্য জনসভা, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ সংগঠিত করেছিল এবং তাতে অংশগ্রহণ করেছিল।

২. অহিংস অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-১৯২২)

  • যুবকদের উপর গান্ধীর প্রভাব: মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগের আহ্বান ছাত্রদের মধ্যে গভীরভাবে অনুরণিত হয়েছিল, যারা এটিকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক ও কার্যকর উপায় হিসেবে দেখেছিল।
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বয়কট: বহু ছাত্র সরকারি অধিভুক্ত স্কুল ও কলেজ ত্যাগ করে জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছিল বা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।
  • বার্তা প্রচার: ছাত্ররা গ্রামীণ এলাকায় অসহযোগ আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে এবং সমাজের বৃহত্তর অংশকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
  • স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী: বিক্ষোভ সংগঠিত করতে এবং শোভাযাত্রার সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ছাত্র স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠিত হয়েছিল।

৩. আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-১৯৩৪)

  • সত্যাগ্রহে সক্রিয় অংশগ্রহণ: ছাত্ররা লবণ সত্যাগ্রহ ও অন্যান্য অন্যায় আইনের অমান্য সহ বিভিন্ন ধরনের সত্যাগ্রহে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।
  • পিকেটিং ও বিক্ষোভ: তারা বিদেশি পণ্য, সরকারি অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে পিকেটিং সংগঠিত করেছিল।
  • জাতীয়তাবাদী ধারণা প্রচার: ছাত্ররা জাতীয়তাবাদী সাহিত্য ও ধারণা প্রচার এবং আন্দোলনের পক্ষে জনমত গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল।
  • দমন-পীড়নের শিকার: অংশগ্রহণের জন্য ছাত্ররা গ্রেপ্তার, লাঠিচার্জ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কারের শিকার হয়েছিল।

৪. ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)

  • অগ্রণী কর্মী: জাতীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের পর ছাত্ররা প্রায়শই ভারত ছাড়ো আন্দোলনের অগ্রভাগে চলে এসেছিল।
  • গোপন প্রতিরোধ: বহু ছাত্র আত্মগোপনে চলে যায়, গোপন সংগঠন তৈরি করে, জাতীয়তাবাদী সাহিত্য বিতরণ করে এবং ঔপনিবেশিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রমে অংশ নেয়।
  • স্থানীয় নেতৃত্ব: ছাত্ররা প্রায়শই স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব গ্রহণ করে, বিক্ষোভ সংগঠিত করে এবং সম্প্রদায়কে একত্রিত করে।
  • আত্মত্যাগ ও শহীদ: ভারত ছাড়ো আন্দোলনের তীব্র দমন-পীড়নের সময় বহু ছাত্র তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে ছাত্রদের অংশগ্রহণ

আরও বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আদর্শ দ্বারা চালিত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্র সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল, বিশ্বাস করে যে ব্রিটিশ শাসন উৎখাতের জন্য শক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।

  • বিপ্লবী দলের গঠন: ছাত্ররা বিভিন্ন সশস্ত্র বিপ্লবী দল গঠন করে এবং তাতে যোগ দেয়, যা প্রায়শই গোপনে কাজ করত।
  • প্রশিক্ষণ ও মতাদর্শ: এই দলগুলি অস্ত্রের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দিত এবং বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের দৃঢ় ধারণা পোষণ করত।
  • সরাসরি পদক্ষেপ: ছাত্র বিপ্লবীরা বোমা হামলা, ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের হত্যা ও সশস্ত্র বিদ্রোহে অংশ নিত।

অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি

  • গঠন: ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সময় ছাত্রদের অংশগ্রহণ বন্ধ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের জারিকৃত সার্কুলারের সরাসরি প্রতিক্রিয়ায় বাংলায় অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি গঠিত হয়েছিল।
  • উদ্দেশ্য: এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এই দমনমূলক সার্কুলারের বিরোধিতা করা এবং ছাত্রদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা।
  • সংগঠন ও সমর্থন: সোসাইটি ছাত্রদের সংগঠিত করতে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের অংশগ্রহণের অধিকারের পক্ষে সমর্থন জোগাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স

  • বিপ্লবী সংগঠন: বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ছিল বাংলার একটি বিশিষ্ট বিপ্লবী সংগঠন যা বহু ছাত্রকে আকৃষ্ট করেছিল।
  • সশস্ত্র কার্যকলাপ: বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্যরা ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সশস্ত্র কার্যক্রমে জড়িত ছিল।
  • নেতৃত্ব: এই সংগঠন উল্লেখযোগ্য বিপ্লবী তৈরি করেছিল যারা সশস্ত্র প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

সূর্য সেন

  • শিক্ষক ও বিপ্লবী: সূর্য সেন, যিনি মাস্টারদা নামে জনপ্রিয়, ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক যিনি চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের একজন প্রধান নেতা হয়ে উঠেছিলেন।
  • চট্টগ্রাম বিদ্রোহ: তিনি ১৯৩০ সালের বিখ্যাত চট্টগ্রাম বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যেখানে তরুণ বিপ্লবীদের একটি দল, যাদের অধিকাংশই ছাত্র ছিল, অস্ত্রাগার ও অন্যান্য সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ করেছিল।
  • যুবকদের অনুপ্রেরণা: সূর্য সেনের সাহস ও নেতৃত্ব অসংখ্য ছাত্রকে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

বীণা দাস

  • বিপ্লবী কর্মী: বীণা দাস ছিলেন একজন ছাত্রী যিনি ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
  • প্রতিবাদের প্রতীক: তার সাহসী পদক্ষেপ, যদিও অসফল, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল এবং বহু তরুণীকে সংগ্রামে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল।

রশিদ আলি দিবস

  • প্রেক্ষাপট: রশিদ আলি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর (INA) একজন কর্মকর্তা, যাকে ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশরা কোর্ট-মার্শাল করে।
  • ছাত্র বিক্ষোভ: তার কারাদণ্ড বিশেষ করে কলকাতার ছাত্রদের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়।
  • গুরুত্ব: রশিদ আলি দিবস (১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৬) কলকাতায় ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভের সাক্ষী ছিল যা সহিংস রূপ নেয়, যা ব্রিটিশ শাসনের শেষ বছরগুলিতেও ছাত্রদের মধ্যে ঔপনিবেশিক বিরোধী মনোভাব এবং INA-এর প্রতি তাদের সংহতি তুলে ধরে।

ছাত্র আন্দোলনের বিশ্লেষণ

বিশ শতকের ছাত্র আন্দোলনগুলি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী শক্তি ছিল। তাদের অবদানগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • বৈপ্লবিক চেতনা সঞ্চার: ছাত্ররা প্রায়শই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে একটি বিপ্লবী চেতনা যোগ করত, আরও জোরালো পদক্ষেপের জন্য চাপ দিত।
  • যুবকদের সংগঠন: তারা কার্যকরভাবে যুব জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে স্বাধীনতা সংগ্রামে সংগঠিত করেছিল।
  • নেতৃত্ব প্রদান: ছাত্ররা বিশেষ করে ব্যাপক গ্রেপ্তারের সময় স্থানীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদান করত।
  • সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: তাদের সক্রিয়তা ঔপনিবেশিক শাসনের অবিচার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং বৃহত্তর অংশগ্রহণে উৎসাহিত করে।
  • কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ: ছাত্ররা নির্ভয়ে ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, তরুণ প্রজন্মের শক্তি ও সংকল্প প্রদর্শন করে।
  • বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অবদান: একনিষ্ঠ ছাত্রদের একটি দল সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রামে অবদান রাখে, অপরিসীম সাহস ও আত্মত্যাগ প্রদর্শন করে।

তবে, এটাও স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ যে:

  • অসম গোষ্ঠী: ছাত্রদের মধ্যে বিভিন্ন মতাদর্শ ছিল এবং বিভিন্ন অঞ্চল ও সামাজিক পটভূমিতে তাদের অংশগ্রহণ ভিন্ন ছিল।
  • মাঝে মাঝে অভ্যন্তরীণ সংঘাত: মতাদর্শের পার্থক্য কখনও কখনও ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের দিকে পরিচালিত করত।
  • শিক্ষার উপর প্রভাব: রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ কখনও কখনও ছাত্রদের শিক্ষাকে ব্যাহত করত।
Scroll to Top