বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার বিকাশ

বিষয়বস্তু: উনিশ শতক ও বিশ শতকের শুরুতে বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার অগ্রগতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। এই বিকাশ কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রগতির জন্যই নয়, তৎকালীন আর্থ-সামাজিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রেও অপরিহার্য ছিল। এই আলোচনায় ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স, কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ ও বসুবিজ্ঞান মন্দিরের মতো অগ্রণী প্রতিষ্ঠানগুলির বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে ভূমিকা সংক্ষেপে তুলে ধরা হবে। এছাড়াও, বাংলায় কারিগরি শিক্ষার বিকাশ এবং সেই ক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের অবদান আলোচনা করা হবে।

বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়

বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তনের মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপিত হয়। তবে, উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও শিক্ষার জন্য নিবেদিত প্রতিষ্ঠানগুলি পরবর্তীকালে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের স্বপ্ন ও দেশীয় বৈজ্ঞানিক দক্ষতার ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে।

  • প্রাথমিক উদ্যোগ: হিন্দু কলেজ (পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, প্রায়শই তাত্ত্বিক দিকের উপর জোর দেওয়া হত। উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবী মহল ক্রমশ অনুভব করতে শুরু করে।
  • আত্মনির্ভরতার চেতনা: উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে জাতীয়তাবাদী ভাবনার উন্মেষ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। এই চেতনা দেশীয় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনে ইন্ধন যোগায়।

বিজ্ঞান চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান

১. ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স (IACS)

  • গুরুত্ব: ১৮৭৬ সালে ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত IACS ছিল ভারতে প্রথম বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যা ভারতীয়দের দ্বারা মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণরূপে নিবেদিত ছিল। এটি বৈজ্ঞানিক প্রতিভা লালন ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় মৌলিক অনুসন্ধানের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • প্রভাব:
    • অগ্রণী গবেষণা: IACS পদার্থবিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে যুগান্তকারী গবেষণার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এটি প্রতিভাবান ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করে যারা আলোকবিজ্ঞান, ध्वনিতত্ত্ব ও চুম্বকত্বের মতো ক্ষেত্রে মৌলিক কাজ করেছিলেন।
    • নোবেলজয়ীর সাথে সংযোগ: IACS-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল কৃতিত্ব হল স্যার সি.ভি. রামন কর্তৃক এই প্রতিষ্ঠানে আলোক বিচ্ছুরণ (রামন প্রভাব) নিয়ে তাঁর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী গবেষণা। এটি ভারতীয় বিজ্ঞানকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়।
    • ভবিষ্যতের বিজ্ঞানীদের অনুপ্রেরণা: IACS প্রজন্মের পর প্রজন্ম ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করেছে এবং স্বাধীন বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। এটি প্রমাণ করে যে ভারতীয়রা কেবল ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর না করেও উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে।
    • আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি: IACS-এ পরিচালিত গবেষণা ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানের বিকাশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে।

২. কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ (রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজ)

  • গুরুত্ব: কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ, আনুষ্ঠানিকভাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ নামে পরিচিত, ১৯১৪ সালে স্যার তারকনাথ পালিত ও স্যার রাসবিহারী ঘোষের উদার দানে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার মধ্যে উন্নত বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
  • প্রভাব:
    • বিস্তৃত বিজ্ঞান শিক্ষা: বিজ্ঞান কলেজ পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান ও ফলিত বিজ্ঞান সহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় স্নাতকোত্তর শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ প্রদান করে।
    • বিশিষ্ট বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ: এটি স্যার সি.ভি. রামন (প্রাথমিকভাবে), সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা ও প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মতো ভারতের সবচেয়ে উজ্জ্বল বৈজ্ঞানিক প্রতিভাগুলিকে শিক্ষক হিসেবে আকৃষ্ট করে।
    • উন্নত গবেষণার কেন্দ্র: কলেজটি উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি বিশিষ্ট কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা ভারতে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
    • জাতীয়তাবাদী প্রচেষ্টা: বিজ্ঞান কলেজের প্রতিষ্ঠা একটি জাতীয়তাবাদী উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল দেশীয় বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং উচ্চতর বৈজ্ঞানিক শিক্ষার জন্য বিদেশী প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরতা হ্রাস করা।

৩. বসু বিজ্ঞান মন্দির

  • গুরুত্ব: ১৯১৭ সালে আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বসু বিজ্ঞান মন্দির পদার্থবিজ্ঞান, উদ্ভিদ শারীরবিদ্যা এবং পরবর্তীতে অন্যান্য প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণার জন্য নিবেদিত ছিল। বসু এটিকে আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার কেন্দ্র এবং ভারতের বৈজ্ঞানিক দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে কল্পনা করেছিলেন।
  • প্রভাব:
    • অগ্রণী আন্তঃবিভাগীয় গবেষণা: বসু নিজেই জীবন্ত ও জড় পদার্থের মধ্যে সাদৃশ্য নিয়ে, বিশেষ করে উদ্ভিদের উদ্দীপকের প্রতি প্রতিক্রিয়া নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।
    • দেশীয় সম্পদের উপর জোর: প্রতিষ্ঠানটি দেশীয় সম্পদের ব্যবহার ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের একটি সামগ্রিক পদ্ধতির উপর জোর দেয়।
    • সাধারণের সাথে বিজ্ঞানের সংযোগ: বসু বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার এবং মন্দিরে বক্তৃতা ও প্রদর্শনের মাধ্যমে বৃহত্তর জনসাধারণের কাছে এটিকে সহজলভ্য করার জন্য আগ্রহী ছিলেন।
    • বৈজ্ঞানিক অর্জনের জাতীয় প্রতীক: বসু বিজ্ঞান মন্দির ভারতীয় বৈজ্ঞানিক অর্জন ও স্বাধীন গবেষণার সম্ভাবনার একটি জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়।

কারিগরি শিক্ষার বিকাশ

শিল্প উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার জন্য কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করে বাংলায় এটিকে উৎসাহিত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়।

  • প্রাথমিক কারিগরি বিদ্যালয়: বিজ্ঞান শিক্ষার বিকাশের পাশাপাশি, বিভিন্ন কারিগরি বিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়, প্রায়শই বেসরকারি উদ্যোগ ও জনহিতকর প্রচেষ্টার মাধ্যমে। এই প্রতিষ্ঠানগুলির লক্ষ্য ছিল প্রকৌশল, বস্ত্র ও উৎপাদন শিল্পের মতো ক্ষেত্রে ব্যবহারিক দক্ষতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
  • ঔপনিবেশিক কারিগরি শিক্ষার সীমাবদ্ধতা: ঔপনিবেশিক সরকারের কারিগরি শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়শই সীমিত ছিল এবং মূলত ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও শিল্পের চাহিদা পূরণের দিকে চালিত ছিল। একটি আরও ব্যাপক ও জাতীয়ভাবে ориентированный কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য ক্রমবর্ধমান চাহিদা ছিল।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ও বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের ভূমিকা

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে স্বদেশী আন্দোলন দেশীয় কারিগরি শিক্ষার বিকাশে significant impetus যোগায়।

  • জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (NCE): ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (Jatiya Shiksha Parishad) ছিল তৎকালীন জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার প্রত্যক্ষ ফল। এর লক্ষ্য ছিল এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও প্রচার করা যা জাতীয় চরিত্রের হবে এবং দেশের কারিগরি ও শিল্প চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে। NCE এমন একটি পাঠ্যক্রমের কল্পনা করেছিল যা ভারতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সাথে বিজ্ঞান ও কারিগরি বিষয়গুলিকে একত্রিত করবে।
  • বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (BTI): বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট (যা পরবর্তীতে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি কলেজ এবং বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত) ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • BTI-এর প্রভাব:
    • কারিগরি শিক্ষার পথিকৃৎ: BTI প্রকৌশল ও ফলিত বিজ্ঞানের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও শিল্প প্রাসঙ্গিকতার উপর জোর দিয়ে কারিগরি শিক্ষা প্রদানের একটি অগ্রণী প্রতিষ্ঠান ছিল।
    • জাতীয়তাবাদী উদ্যোগ: এটি কারিগরি দক্ষতায় আত্মনির্ভরতার জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার একটি বাস্তব প্রকাশ ছিল এবং এমন দক্ষ ব্যক্তিদের একটি পুল তৈরি করার লক্ষ্য ছিল যারা ভারতের শিল্প উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।
    • পাঠ্যক্রম সংস্কার: BTI জাতীয় চাহিদা অনুসারে এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অন্তর্ভুক্ত করে একটি পাঠ্যক্রমের উপর জোর দেয়।
    • ভবিষ্যতের প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের অনুপ্রেরণা: ইনস্টিটিউটটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে যারা পরবর্তীতে ভারতের শিল্প ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।
Scroll to Top