বিষয়বস্তু: ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর ৫৬০টিরও বেশি দেশীয় রাজ্যের ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া ছিল এক বিশাল কর্মযজ্ঞ, যা বহু চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। এই আলোচনায় এই অন্তর্ভুক্তি অর্জনের জন্য ভারতীয় নেতৃত্ব কর্তৃক গৃহীত উদ্যোগ এবং এই প্রক্রিয়ায় উদ্ভূত বিতর্কগুলি তুলে ধরা হবে। উপরন্তু, ১৯৪৭ এবং ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রের সাহায্যে এই অন্তর্ভুক্তির প্রেক্ষাপটে ভারত রাষ্ট্রের পরিবর্তিত অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সীমানা চিহ্নিত করা হবে।
দেশীয় রাজ্যগুলির সমস্যা
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় ব্রিটিশ ভারতের পাশাপাশি বিভিন্ন আকারের, জনসংখ্যা ও সম্পদযুক্ত অসংখ্য দেশীয় রাজ্য বিদ্যমান ছিল। এই রাজ্যগুলি ব্রিটিশ আধিপত্যের অধীনে অভ্যন্তরীণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত। ১৯৪৭ সালের ভারতীয় স্বাধীনতা আইন এই রাজ্যগুলিকে তিনটি বিকল্প প্রদান করে: ভারতে যোগদান, পাকিস্তানে যোগদান অথবা স্বাধীন থাকা। এটি নবগঠিত ভারতীয় রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ
সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী ও রাজ্য দপ্তরের মন্ত্রী এবং ভি.পি. মেনন, রাজ্য দপ্তরের সচিবের নেতৃত্বে ভারতীয় নেতৃত্ব এই দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য একটি বহুমুখী পদ্ধতি গ্রহণ করে:
- বোঝানো ও কূটনীতি: প্যাটেল ও মেনন দক্ষতার সাথে বোঝানো ও কূটনৈতিক আলোচনার আশ্রয় নেন, শাসকদের দেশপ্রেম ও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের প্রতি আবেদন জানান। তারা বেশিরভাগ রাজ্যের ভৌগোলিক সান্নিধ্য ও সাংস্কৃতিক আত্মীয়তার উপর জোর দেন।
- স্থগিতাদেশ চুক্তি (Standstill Agreement): আলোচনার সময়কালে নতুন ভারতীয় সরকারের সাথে বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও পরিষেবাগুলির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য শাসকদের এই চুক্তি প্রস্তাব করা হয়।
- অন্তর্ভুক্তি চুক্তি (Instrument of Accession): এই আইনি নথিটি দেশীয় রাজ্যগুলির আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় অধিরাজ্যে অন্তর্ভুক্তির মূল হাতিয়ার ছিল। প্রাথমিকভাবে এটি কেবল তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করত: প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক বিষয় ও যোগাযোগ। শাসকদের এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে রাজি করানো হয়, যার মাধ্যমে তারা এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির নিয়ন্ত্রণ ভারতীয় সরকারের হাতে ছেড়ে দেন।
- স্বত্ববিলোপ নীতির বিপরীত: ব্রিটিশদের স্বত্ববিলোপ নীতির বিপরীতে, যেখানে প্রাকৃতিক উত্তরাধিকারীর অভাবে রাজ্যগুলিকে অধিগ্রহণ করা হত, ভারতীয় সরকার শাসকদের অন্তর্ভুক্তি চুক্তির বিনিময়ে তাদের শাসন ও প্রিভি পার্স (রাজকীয় ভাতা) অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেয়।
- জনগণের আন্দোলন: অনেক রাজ্যে ভারতে যোগদানের দাবিতে জনগণের আন্দোলন শাসকদের সিদ্ধান্ত নিতে চাপ সৃষ্টি করে। ভারতীয় সরকার প্রায়শই এই আন্দোলনগুলিকে নীরবে সমর্থন করে।
- প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ: কয়েকটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে যেখানে শাসকরা অনমনীয় ছিলেন এবং ভারতের স্থিতিশীলতা ও অখণ্ডতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছিলেন, ভারতীয় সরকার বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছিল। জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত বিতর্ক
দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া বিতর্কমুক্ত ছিল না:
- জুনাগড়: হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা এবং একজন মুসলিম শাসক থাকা সত্ত্বেও জুনাগড়ের নবাব প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে ব্যাপক বিক্ষোভ ও গণ অভ্যুত্থান দেখা দেয়। পাকিস্তান তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে অস্বীকার করার পর ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করে এবং গণভোটে এখানকার জনগণ বিপুলভাবে ভারতে যোগদানের পক্ষে রায় দেয়।
- হায়দ্রাবাদ: হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা এবং একজন মুসলিম শাসক দ্বারা শাসিত একটি বৃহৎ ও ধনী রাজ্য হায়দ্রাবাদের নিজাম প্রাথমিকভাবে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। তবে, রাজাকারদের (একটি বেসরকারি মিলিশিয়া) অত্যাচারী শাসন এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী “অপারেশন পোলো” চালায়, যার ফলে হায়দ্রাবাদ ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
- জম্মু ও কাশ্মীর: জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং প্রাথমিকভাবে স্বাধীন থাকার আশা নিয়ে তার সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছিলেন। তবে, অক্টোবর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-সমর্থিত উপজাতি মিলিশিয়াদের আক্রমণের ফলে তিনি ভারতের সাহায্য চাইতে এবং অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই অন্তর্ভুক্তি শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল এবং প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়। কাশ্মীরের মর্যাদা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি বিতর্কিত বিষয় রয়ে গেছে।
- ত্রাভাঙ্কোর ও কোচিন: এই রাজ্যগুলির প্রাথমিকভাবে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাও কিছু উদ্বেগের কারণ হয়েছিল, তবে নেতাদের বোঝানো ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে তারা শেষ পর্যন্ত ভারতে যোগদান করে এবং পরবর্তীতে একত্রিত হয়ে ত্রাভাঙ্কোর-কোচিন রাজ্য (বর্তমানে কেরালা) গঠন করে।
- প্রিভি পার্সের সমস্যা: প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হলেও, প্রাক্তন শাসকদের দেওয়া প্রিভি পার্স পরবর্তী বছরগুলিতে বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে, যা কারও কারও কাছে সেকেলে এবং জাতীয় কোষাগারের উপর বোঝা হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭১ সালে ভারত সরকার কর্তৃক এটি অবশেষে বিলুপ্ত করা হয়।
ভারতের পরিবর্তিত সীমানা (১৯৪৭-১৯৬৪)
দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তি ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সীমানাকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করে।
ভারতের মানচিত্র, ১৯৪৭:
- বাহ্যিক সীমানা: ভারত র্যাডক্লিফ লাইন দ্বারা মূলত নির্ধারিত সীমানা নিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে, যা ব্রিটিশ ভারতকে ভারত ও পাকিস্তানে বিভক্ত করে। এই প্রাথমিক মানচিত্রে পাকিস্তান দুটি অংশে বিভক্ত ছিল: পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ)। বেশ কয়েকটি দেশীয় রাজ্য এই সীমানার মধ্যে দেখানো হয়েছিল, যারা তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেনি। এই সময়ে বাহ্যিক সীমানা সংক্রান্ত প্রধান বিতর্কিত ক্ষেত্রগুলির মধ্যে ছিল কাশ্মীরের মর্যাদা এবং পাকিস্তানের সাথে সীমান্তের demarcation।
- অভ্যন্তরীণ সীমানা: অভ্যন্তরীণ মানচিত্র ব্রিটিশ ভারতের প্রদেশ এবং অসংখ্য দেশীয় রাজ্যের একটি জটিল মিশ্রণ ছিল। এই দেশীয় রাজ্যগুলি বৃহত্তর প্রদেশগুলির মধ্যে বিভিন্ন আকারের ও প্রশাসনিক কাঠামোর ছিটমহল ছিল।
(১৯৪৭ সালের ভারতের একটি মানচিত্র কল্পনা করুন যেখানে ব্রিটিশ ভারতীয় প্রদেশগুলি এবং হায়দ্রাবাদ, কাশ্মীর, জুনাগড়, ত্রাভাঙ্কোর ইত্যাদির মতো প্রধান দেশীয় রাজ্যগুলির অবস্থান দেখানো হয়েছে)
ভারতের মানচিত্র, ১৯৬৪:
- বাহ্যিক সীমানা: ১৯৬৪ সালের মধ্যে ভারতের বাহ্যিক সীমানা আরও সুনির্দিষ্ট হয়ে ওঠে, যদিও কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের সাথে এবং কিছু সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে চীনের সাথে বিরোধ অব্যাহত ছিল। মানচিত্রে স্পষ্টভাবে পাকিস্তান এবং এই সময়ের মধ্যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে প্রভাব দেখানো হবে।
- অভ্যন্তরীণ সীমানা: দেশীয় রাজ্যগুলির অন্তর্ভুক্তির কারণে অভ্যন্তরীণ মানচিত্রে একটি আমূল পরিবর্তন ঘটে। ১৯৬৪ সালের মানচিত্রে একটি আরও সুসংহত ভারত দেখানো হবে যেখানে প্রাক্তন দেশীয় রাজ্যগুলি হয় বিদ্যমান প্রদেশগুলির সাথে একীভূত হয়েছে অথবা নতুন রাজ্যে পুনর্গঠিত হয়েছে। ১৯৫০-এর দশকে গতি লাভ করা রাজ্যগুলির ভাষাগত পুনর্গঠনও স্পষ্ট হবে, যার ফলে অন্ধ্র প্রদেশ, কেরালা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ইত্যাদির মতো রাজ্য গঠিত হবে। মহীশূর (বর্তমানে কর্ণাটক), রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের মতো প্রাক্তন দেশীয় রাজ্যগুলি বৃহত্তর, সুসংহত সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হবে। প্রাক্তন ফরাসি ও পর্তুগিজ উপনিবেশগুলিও (যেমন পন্ডিচেরি ও গোয়া) ভারতের সাথে একীভূত হবে।