ভূমিকা
কোষ বিভাজন এবং কোষ চক্র হলো জীববিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা কোষের বৃদ্ধি, বিকাশ এবং বংশগতি নিশ্চিত করে। এই প্রক্রিয়ার একটি প্রধান উপাদান হল ক্রোমোজোম, যা জেনেটিক তথ্য বহন করে। এই নিবন্ধে আমরা ক্রোমোজোমের প্রকারভেদ (অটোসম ও লিঙ্গ ক্রোমোজোম), ক্রোমোজোম সংখ্যা, গঠন, এবং রাসায়নিক উপাদানসমূহ সহজ ভাষায় বিশ্লেষণ করব।
ক্রোমোজোমের প্রকারভেদ
ক্রোমোজোম হল DNA এবং প্রোটিন দ্বারা গঠিত সুতা সদৃশ কাঠামো, যা ইউক্যারিওটিক কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থান করে। এগুলি প্রধানত দুই প্রকারের হয়:
১. অটোসম (Autosome)
- অটোসম হলো সাধারণ দেহগত ক্রোমোজোম, যা শরীরের সাধারণ বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে।
- মানবদেহে ২২ জোড়া (মোট ৪৪টি) অটোসম রয়েছে।
- দেহের উচ্চতা, চুলের রং, বিপাক প্রক্রিয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে।
২. সেক্স ক্রোমোজোম (Sex Chromosome)
- লিঙ্গ ক্রোমোজোমকে অ্যালোসোম (Allosome) ও বলা হয়, যা জীবের লিঙ্গ নির্ধারণ করে।
- মানবদেহে ১ জোড়া (মোট ২টি) সেক্স ক্রোমোজোম থাকে:
- XX হলে নারী
- XY হলে পুরুষ
- Y ক্রোমোজোম পুরুষের বৈশিষ্ট্য গঠনে ভূমিকা রাখে, আর X ক্রোমোজোম উভয় লিঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন জীবের ক্রোমোজোম সংখ্যা
প্রতিটি জীবের কোষে নির্দিষ্ট সংখ্যক ক্রোমোজোম থাকে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অপরিবর্তিত থাকে। কিছু উদাহরণ:
| জীবের নাম | ক্রোমোজোম সংখ্যা |
| মানব (Homo sapiens) | ৪৬ (২৩ জোড়া) |
| ফলমাছি (Drosophila melanogaster) | ৮ (৪ জোড়া) |
| ধান (Oryza sativa) | ২৪ (১২ জোড়া) |
| ব্যাঙ (Rana tigrina) | ২৬ (১৩ জোড়া) |
জীবের কোষে সাধারণত দুই ধরণের ক্রোমোজোম সংখ্যা থাকে:
- ডিপ্লয়েড (2n): দুই সেট ক্রোমোজোম থাকে (যেমন: মানবদেহের দেহকোষ – ৪৬)।
- হ্যাপ্লয়েড (n): এক সেট ক্রোমোজোম থাকে (যেমন: মানবদেহের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু – ২৩)।
ক্রোমোজোমের গঠন
ক্রোমোজোম হলো DNA ও প্রোটিন দ্বারা গঠিত জটিল কাঠামো। এর প্রধান অংশগুলো হলো:
১. ক্রোমাটিড (Chromatid)
- প্রতিটি ক্রোমোজোমে দুটি সমান ক্রোমাটিড থাকে, যা সেন্ট্রোমিয়ার মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে।
- DNA প্রতিলিপি প্রক্রিয়ার সময় ক্রোমাটিড গঠিত হয়।
২. ক্রোমোনেমাটা (Chromonemata)
- এটি পাতলা, সুতা সদৃশ তন্তু, যা ক্রোমাটিডের মধ্যে থাকে।
- এটি জিন বহন করে এবং ক্রোমোজোম গঠনে ভূমিকা রাখে।
৩. সেন্ট্রোমিয়ার (Centromere)
- এটি হলো সংকুচিত অংশ, যেখানে দুইটি ক্রোমাটিড যুক্ত থাকে।
- মাইটোসিস ও মিয়োসিসের সময় স্পাইন্ডল ফাইবার সংযোজন ঘটে।
- সেন্ট্রোমিয়ারের অবস্থান অনুযায়ী ক্রোমোজোমের ধরণ:
- মেটাসেন্ট্রিক – সেন্ট্রোমিয়ার মাঝখানে
- সাবমেটাসেন্ট্রিক – সামান্য একদিকে সরানো
- অ্যাক্রোসেন্ট্রিক – এক প্রান্তের কাছে
- টেলোসেন্ট্রিক – একেবারে প্রান্তে
৪. সেকেন্ডারি সংকোচন ও নিউক্লিওলার অর্গানাইজার অঞ্চল (NOR)
- কিছু ক্রোমোজোমে সেকেন্ডারি সংকোচন থাকে।
- NOR (Nucleolar Organizer Region) থেকে নিউক্লিয়াস গঠিত হয়।
৫. স্যাটেলাইট (Satellite)
- কিছু ক্রোমোজোমে একটি ছোট DNA অংশ পাতলা ডাঁটির মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে, যা জেনেটিক কার্যকলাপে সাহায্য করে।
৬. টেলোমিয়ার (Telomere)
- এটি ক্রোমোজোমের প্রান্তে অবস্থিত ক্যাপ।
- এটি ক্রোমোজোমকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করে এবং কোষ বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত।
ক্রোমোজোমের রাসায়নিক উপাদান
ক্রোমোজোম প্রধানত প্রোটিন এবং নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA ও RNA) দ্বারা গঠিত।
১. প্রোটিন
- ক্রোমোজোমে হিস্টোন ও নন-হিস্টোন প্রোটিন থাকে, যা DNA প্যাকেজিং-এ সাহায্য করে।
- হিস্টোন প্রোটিন DNA-কে ক্রোমাটিন গঠনে সহায়তা করে।
২. নিউক্লিক অ্যাসিড (DNA ও RNA)
ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (DNA)
- DNA হল প্রধান জিনগত উপাদান, যা নিউক্লিয়াসে থাকে।
- এটি নিউক্লিওটাইড দ্বারা গঠিত:
- অ্যাডেনিন (A)
- থাইমিন (T)
- সাইটোসিন (C)
- গুয়ানিন (G)
- A-T এবং C-G হাইড্রোজেন বন্ধনের মাধ্যমে ডাবল হেলিক্স গঠন করে।
- S-ফেজে DNA প্রতিলিপি ঘটে, যা বংশগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে সাহায্য করে।
DNA-এর কার্যাবলি
- জেনেটিক তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রোটিন সংশ্লেষণ নিয়ন্ত্রণ।
- বিবর্তন ও বৈচিত্র্যের কারণ হিসেবে কাজ করে।
রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (RNA)
- RNA হলো একক সুত্রবিশিষ্ট নিউক্লিক অ্যাসিড, যা প্রোটিন সংশ্লেষণে সাহায্য করে।
- এটি নিউক্লিয়াস, সাইটোপ্লাজম ও রাইবোসোমে পাওয়া যায়।
- RNA-তে উরাসিল (U) থাকে, থাইমিন (T) থাকে না।
RNA-এর প্রকারভেদ ও কার্যাবলি
- mRNA (মেসেঞ্জার RNA): DNA থেকে প্রোটিন সংশ্লেষণের সংকেত বহন করে।
- rRNA (রাইবোসোমাল RNA): রাইবোসোমের গঠন গঠনে সহায়তা করে।
- tRNA (ট্রান্সফার RNA): অ্যামিনো অ্যাসিড বহন করে এবং প্রোটিন সংশ্লেষণে সাহায্য করে।
DNA ও RNA-এর পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | DNA | RNA |
| গঠন | দ্বিসূত্রক | একসূত্রক |
| শর্করা | ডিঅক্সিরাইবোজ | রাইবোজ |
| নাইট্রোজেন ক্ষারক | A, T, C, G | A, U, C, G |
| অবস্থান | নিউক্লিয়াস | নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম |
| কার্যাবলি | জিনগত তথ্য সংরক্ষণ | প্রোটিন সংশ্লেষণ |
ক্রোমোজোম জীবের বৃদ্ধি, বংশগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, এবং কোষ বিভাজনের জন্য অপরিহার্য। এর গঠন ও কার্যাবলি বোঝা জীববিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে তোলে।