বিষয়বস্তু: উনিশ শতকে বাংলা এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক জাগরণের সাক্ষী ছিল, যা ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাস ও রীতিনীতির পুনর্ব্যাখ্যা ও আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম সংস্কার আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। এই আলোচনায় ব্রাহ্ম আন্দোলনের বিবর্তন, বিভাজন, বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা; রামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’-এর আদর্শ; এবং স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কারের অভিমুখ, বিশেষ করে তাঁর ‘নব্য বেদান্ত’-এর ধারণা, তার বৈশিষ্ট্য ও পর্যালোচনা সহ আলোচনা করা হবে।
১. ব্রাহ্ম আন্দোলন: একেশ্বরবাদ ও সংস্কারের পথে যাত্রা
রাজা রামমোহন রায় কর্তৃক প্রবর্তিত ব্রাহ্ম আন্দোলন বাংলার ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিল, যা ঈশ্বরের একেশ্বরবাদী ধারণার পক্ষে কথা বলেছিল এবং বিভিন্ন সামাজিক সংস্কারের নেতৃত্ব দিয়েছিল।
- বিবর্তন: ১৮২৮ সালে ‘ব্রাহ্ম সভা’ নামে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে ব্রাহ্ম সমাজ নামে পরিচিত হয়। রামমোহন রায় হিন্দুধর্মকে কুসংস্কার, প্রতিমাপূজা এবং সামাজিক কুপ্রথা থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি একেশ্বরবাদ, ইসলাম এবং উপনিষদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং ধর্মীয় বিষয়ে যুক্তি ও ব্যক্তিগত বিবেকের উপর জোর দিয়েছিলেন।
- বিভাজন: ১৮৩৩ সালে রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর, আন্দোলন নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, যিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, ব্রাহ্ম সমাজের ভারতীয় দার্শনিক ভিত্তির উপর জোর দেন এবং একটি আরও আধ্যাত্মিক ও কম radical পদ্ধতির উপর মনোযোগ দেন। তবে, কেশবচন্দ্র সেনের অধীনে, আন্দোলন আরও প্রগতিশীল সামাজিক সংস্কার এবং একটি সার্বজনীনতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, যার ফলে বিভাজন ঘটে। সেনের দল ‘ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে পরিচিত হয়, যখন ঠাকুরের দল ‘আদি ব্রাহ্ম সমাজ’ নামে পরিচিত হয়। পরবর্তীতে আরও বিভাজন দেখা যায়, যা বৃহত্তর ব্রাহ্ম আন্দোলনের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করে।
- বৈশিষ্ট্য:
- একেশ্বরবাদ: বহুদেববাদ ও প্রতিমাপূজা প্রত্যাখ্যান করে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস।
- যুক্তি ও বিবেকের উপর জোর: ধর্মীয় উপলব্ধিতে যুক্তিসঙ্গত অনুসন্ধান ও ব্যক্তিগত নৈতিক বিচারের গুরুত্ব প্রদান।
- সামাজিক সংস্কার: সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নারী শিক্ষার সমর্থন।
- সার্বজনীনতাবাদ: সকল ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্যকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি প্রচারের প্রবণতা।
- শাস্ত্রীয় অভ্রান্ততা প্রত্যাখ্যান: ধর্মীয় গ্রন্থকে সম্মান করলেও, আন্দোলন অন্ধবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে যুক্তির প্রাধান্য দেয়।
- পর্যালোচনা: ব্রাহ্ম আন্দোলন বাংলার নবজাগরণে ঐতিহ্যবাহী গোঁড়ামি চ্যালেঞ্জ করে এবং ধর্ম ও সমাজের প্রতি আরও যুক্তিসঙ্গত ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এটি সামাজিক সংস্কার ও বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল, যদিও এর সরাসরি গণআবেদন সীমিত ছিল।
২. রামকৃষ্ণের ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’-এর আদর্শ
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস (১৮৩৬-১৮৮৬), একজনMystic ও আধ্যাত্মিক শিক্ষক, ধর্মীয় উপলব্ধির একটি ভিন্ন পদ্ধতি উপস্থাপন করেন, যা সকল ধর্মের অন্তর্নিহিত ঐক্যের উপর জোর দেয়। তাঁর ‘সর্বধর্ম সমন্বয়’ বা সকল ধর্মের মিলন ধারণাটি আধুনিক ভারতীয় চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে।
- প্রেক্ষাপট: ধর্মীয় বৈচিত্র্য ও মাঝে মাঝে সংঘাতের সময়ে, রামকৃষ্ণ হিন্দুধর্ম, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম সহ বিভিন্ন ধর্মীয় পথে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি লাভ করেন। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে সকল ধর্ম একই চূড়ান্ত সত্যের দিকে পরিচালিত বিভিন্ন পথ।
- মূল ধারণা:
- সকল ধর্মের ঐক্য: রামকৃষ্ণ বিশ্বাস করতেন যে বিভিন্ন ধর্ম একই লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত বিভিন্ন পথের মতো – ঈশ্বর বা পরম বাস্তবতা।
- “যত মত তত পথ”: এই বিখ্যাত উক্তিটি তাঁর মূল বিশ্বাসকে ধারণ করে যে প্রতিটি ধর্ম ঐশ্বরিকতার সাথে সংযোগ স্থাপনের একটি বৈধ উপায় সরবরাহ করে।
- ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর জোর: তিনি মতবাদ ও আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে প্রত্যক্ষ আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার গুরুত্বের উপর জোর দেন।
- সকল ধর্মের প্রতি সম্মান: তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি সহিষ্ণুতা ও বোঝাপড়ার পক্ষে কথা বলেন।
- পর্যালোচনা: রামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয়ের শিক্ষা ভারতের মতো বহু ধর্মীয় সমাজে গভীর resonance সৃষ্টি করে। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সকল ধর্মের অন্তর্নিহিত ঐক্যের উপর জোর সহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদান করে। ব্রাহ্ম সমাজের মতো সরাসরি সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িত না থাকলেও, তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব পরোক্ষভাবে একটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহানুভূতিশীল ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে।
৩. স্বামী বিবেকানন্দের ধর্ম সংস্কারের অভিমুখ: নব্য বেদান্ত
স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২), রামকৃষ্ণের প্রধান শিষ্য, তাঁর গুরুর শিক্ষাকে পাশ্চাত্য দর্শন ও আধুনিক চিন্তার সাথে সংশ্লেষিত করে বেদান্তের একটি নবজীবন দান করেন যা নব্য বেদান্ত নামে পরিচিত। তিনি হিন্দুধর্মের সংস্কার এবং এর দার্শনিক জ্ঞানকে আধুনিক বিশ্বের জন্য প্রাসঙ্গিক করে তোলার লক্ষ্য রেখেছিলেন।
- প্রেক্ষাপট: বিবেকানন্দ ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে বেদান্তের একটি সংস্কারিত ও গতিশীল উপলব্ধি জাতীয় পুনর্জন্মের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি প্রদান করতে পারে। তিনি আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক কর্মের মধ্যে ব্যবধান দূর করতে চেয়েছিলেন।
- নব্য বেদান্তের মূল ধারণা:
- মানুষের দেবত্ব: বিবেকানন্দ জাতি, ধর্ম ও লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যে অন্তর্নিহিত দেবত্বের উপর জোর দেন।
- ব্যবহারিক বেদান্ত: তিনি দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক কর্মে বেদান্তের ব্যবহারিক প্রয়োগের উপর জোর দেন, মানবজাতির নিঃস্বার্থ সেবা দানকে উপাসনার একটি রূপ হিসেবে সমর্থন করেন।
- সামাজিক ন্যায়বিচার: তিনি অস্পৃশ্যতা ও দরিদ্রদের নিপীড়নের মতো সামাজিক অবিচারগুলির তীব্র নিন্দা করেন, যা তিনি সকল জীবের একত্বের বৈদান্তিক নীতির বিরোধী বলে মনে করতেন।
- সার্বজনীন ধর্ম: বেদান্তের উপর ভিত্তি করে, বিবেকানন্দ একটি সার্বজনীন ধর্মের কল্পনা করেছিলেন যা রামকৃষ্ণের সকল ধর্মের সমন্বয়ের ধারণার প্রতিধ্বনি করে, তবে বেদান্তিক কাঠামোর উপর আরও জোর দিয়ে।
- শক্তি ও নির্ভীকতা: তিনি ভারতীয়দের দুর্বলতা ত্যাগ করে শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকে শক্তি ও নির্ভীকতা অর্জনের আহ্বান জানান, যা আত্মার অন্তর্নিহিত শক্তি থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করে।
- নব্য বেদান্তের বৈশিষ্ট্য:
- মানবতাবাদী: প্রতিটি মানুষের মর্যাদা ও সম্ভাবনার উপর দৃঢ় জোর দেওয়া।
- সক্রিয়তাবাদী: আধ্যাত্মিক অনুশীলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সামাজিক সম্পৃক্ততা ও নিঃস্বার্থ সেবার সমর্থন।
- সার্বজনীনতাবাদী: বৈদান্তিক দর্শনের উপর ভিত্তি করে অন্যান্য ধর্মীয় পথের বৈধতা স্বীকার করা।
- যুক্তিবাদী: আধুনিক বুদ্ধিমত্তার কাছে আবেদন জানিয়ে বেদান্তকে যৌক্তিক ও সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করা।
- জাতীয়তাবাদী: ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয় গর্বের অনুভূতি জন্য একটি আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক ভিত্তি প্রদান করা।
- পর্যালোচনা: স্বামী বিবেকানন্দের নব্য বেদান্ত ভারতের ধর্মীয় ও জাতীয় চেতনার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এটি হিন্দু দর্শনের একটি আধুনিক ও গতিশীল ব্যাখ্যা প্রদান করে যা শিক্ষিত যুবকদের সাথে resonance সৃষ্টি করে এবং ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রতি গর্বের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। সামাজিক সেবা ও মানবতার দেবত্বের উপর তাঁর জোর বহু সামাজিক সংস্কার আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করে এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। বিশ্ব মঞ্চে বেদান্তের তাঁর সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি পশ্চিমে হিন্দু দর্শন প্রচারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ব্রাহ্ম আন্দোলন, রামকৃষ্ণের সর্বধর্ম সমন্বয়ের ধারণা এবং স্বামী বিবেকানন্দের নব্য বেদান্ত উনিশ শতকের বাংলায় ধর্ম সংস্কারের স্বতন্ত্র অথচ আন্তঃসংযুক্ত পদ্ধতির প্রতিনিধিত্ব করে। ব্রাহ্ম সমাজ যেখানে একেশ্বরবাদ ও সরাসরি সামাজিক কর্মের উপর মনোযোগ দিয়েছিল, সেখানে রামকৃষ্ণ ব্যক্তিগত উপলব্ধির মাধ্যমে সকল ধর্মের অন্তর্নিহিত ঐক্যের উপর জোর দিয়েছিলেন এবং বিবেকানন্দ ব্যক্তি ও জাতীয় উত্থানের জন্য বেদান্তের একটি গতিশীল ও সক্রিয়তাবাদী ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন। এই আন্দোলনগুলি সম্মিলিতভাবে ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় গোঁড়ামি চ্যালেঞ্জ করেছিল, সামাজিক ন্যায়বিচারকে উৎসাহিত করেছিল এবং আধুনিক ভারতের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল।