ভূমিকা
সপুষ্পক উদ্ভিদ বা অ্যাঞ্জিওস্পার্ম (Angiosperms) তাদের প্রজনন প্রক্রিয়ার জন্য ফুলের উপর নির্ভর করে। ফুল হল উদ্ভিদের প্রজনন অঙ্গ, যা বিভিন্ন অংশ নিয়ে গঠিত। এসব অংশকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়—
- অপ্রজনন অংশ (যা সরাসরি প্রজননের সাথে যুক্ত নয়)
- প্রজনন অংশ (যা নিষেক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে)
এই নিবন্ধে, আমরা ফুলের চারটি প্রধান গঠনগত অংশ—বৃতি (Calyx), দল (Corolla), পুংকেশর (Androecium) এবং গর্ভকেশর (Gynoecium) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. বৃতি (Calyx): ফুলের বাইরের প্রতিরক্ষামূলক স্তর
বৃতি হলো ফুলের বহিঃস্থ স্তর, যা বৃন্তক (Sepals) নামক ছোট পাতার মতো গঠন দ্বারা গঠিত। এটি ফুলের কুঁড়িকে (Bud) সুরক্ষিত রাখে এবং ফুল ফোটার আগে বিভিন্ন ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
বৃতির কার্যাবলি:
- ফুলের কুঁড়িকে শারীরিক ক্ষতি, প্রতিকূল আবহাওয়া, এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
- কিছু উদ্ভিদে বৃন্তক ফুল ফোটার পরেও বিদ্যমান থাকে এবং সরাসরি আলোকসংশ্লেষণে (Photosynthesis) সাহায্য করে।
- কিছু ক্ষেত্রে, বৃন্তক রঙিন হয়ে পরাগবাহীদের আকৃষ্ট করতে সাহায্য করে, যেমন গুলমোহরের ক্ষেত্রে।
২. দল (Corolla): রঙিন পাপড়ির স্তর
দল হলো ফুলের দ্বিতীয় স্তর, যা পাপড়ি (Petals) দ্বারা গঠিত। এটি সাধারণত উজ্জ্বল রঙের এবং সুগন্ধযুক্ত হয়, যা পরাগবাহী পতঙ্গ ও প্রাণীদের আকৃষ্ট করতে সাহায্য করে।
দলের কার্যাবলি:
- পরাগবাহীদের আকৃষ্ট করে, ফলে পরাগসংযোগ (Pollination) সহজ হয়।
- কিছু ফুলে পাপড়ির উপর নেক্টার গাইড (Nectar Guide) থাকে, যা পরাগবাহীদের সঠিক দিকে পরিচালিত করে।
- ফুলের প্রজনন অঙ্গগুলিকে সুরক্ষা দেয়।
৩. পুংকেশর (Androecium): ফুলের পুরুষ প্রজনন অঙ্গ
পুংকেশর হলো ফুলের পুরুষ প্রজনন অংশ, যা একাধিক পুংদণ্ড (Stamen) দ্বারা গঠিত। প্রতিটি পুংদণ্ড দুটি অংশ নিয়ে গঠিত—
- পরাগধানী (Anther) – এটি পরাগকণা (Pollen Grains) উৎপন্ন করে, যা পুরুষ গ্যামেট বহন করে।
- পুংসূত্র (Filament) – এটি পরাগধানীকে ধরে রাখে, যাতে পরাগ সংযোগ সহজ হয়।
পুংকেশরের কার্যাবলি:
- পরাগ উৎপাদন ও বিস্তার করে, যা নিষেকের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- পরাগকণা ফুলের স্ত্রী প্রজনন অঙ্গে (গর্ভকেশর) স্থানান্তর করতে সাহায্য করে।
- কিছু পরাগধানী বাতাস, জল বা পরাগবাহীদের মাধ্যমে পরাগ ছড়িয়ে দেয়।
৪. গর্ভকেশর (Gynoecium): ফুলের স্ত্রী প্রজনন অঙ্গ
গর্ভকেশর হলো ফুলের স্ত্রী প্রজনন অংশ, যা এক বা একাধিক গর্ভদণ্ড (Carpel/Pistil) দ্বারা গঠিত। প্রতিটি গর্ভদণ্ড তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে গঠিত—
- গর্ভমুন্ড (Stigma) – ফুলের উপরের অংশ, যেখানে পরাগকণা জমা হয়।
- গর্ভনালি (Style) – এটি গর্ভমুন্ডকে গর্ভাশয়ের সাথে সংযুক্ত করে এবং পরাগনলীর মাধ্যমে পরাগকণা গর্ভাশয়ে পৌঁছতে সাহায্য করে।
- গর্ভাশয় (Ovary) – এটি ফুলের স্ত্রী গ্যামেট (Ovule) ধারণ করে এবং নিষেকের পর ফল ও বীজে রূপান্তরিত হয়।
গর্ভকেশরের কার্যাবলি:
- পরাগ গ্রহণ ও নিষেকের জন্য প্রস্তুত থাকে।
- পরাগকণা থেকে উৎপন্ন পরাগনলী (Pollen Tube) এর মাধ্যমে গর্ভাশয়ে গ্যামেট স্থানান্তর নিশ্চিত করে।
- নিষেকের পর, গর্ভাশয় ফল এবং গর্ভধারিত ডিম্বাণু বীজে পরিণত হয়।
উপসংহার
ফুলের চারটি প্রধান অংশ—বৃতি, দল, পুংকেশর, এবং গর্ভকেশর—একসঙ্গে ফুলের গঠন ও প্রজনন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৃতি ও দল পরাগবাহীদের আকৃষ্ট করতে এবং ফুলকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে, যখন পুংকেশর ও গর্ভকেশর যৌন জননের জন্য অপরিহার্য।
এটি পরাগসংযোগ, নিষেক, ও বীজ উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলির ভিত্তি তৈরি করে, যা উদ্ভিদবিজ্ঞানের পাশাপাশি কৃষি, উদ্যানপালন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ।