লেখায় ও রেখায় জাতীয়তাবোধের বিকাশ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

বিষয়বস্তু: উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের শুরুতে বাংলায় জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী জোয়ার দেখা যায়, যা শিল্প ও সাহিত্যের বিভিন্ন রূপে প্রাণবন্ত অভিব্যক্তি খুঁজে পায়। এই আলোচনায় আনন্দমঠ, বর্তমান ভারত ও গোরা-র মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম এবং ভারতমাতা (চিত্র)-এর মধ্যে কীভাবে জাতীয়তাবোধের চেতনা গ্রথিত হয়েছে, তা সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা হবে। প্রসঙ্গত, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রে ঔপনিবেশিক সমাজের সমালোচনার বিষয়টিও এখানে আলোচিত হবে।

সাহিত্য ও চিত্রে জাতীয়তাবাদের প্রকাশ: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

এই সময়ে বাংলা সাহিত্য ও শিল্পকর্মে জাতীয়তাবাদের প্রকাশ বেশ কিছু মূল বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিহ্নিত ছিল:

  • দেশপ্রেমের উদ্দীপনা: এই রচনাগুলির লক্ষ্য ছিল ভারতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং গৌরবময় অতীতের জীবন্ত বর্ণনার মাধ্যমে দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি সঞ্চার করা।
  • ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচনা: এগুলি প্রায়শই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নিপীড়নমূলক চরিত্র, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক অধীনতা এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার সমালোচনা করত।
  • জাতীয় ঐক্যের উপর জোর: এই অভিব্যক্তিগুলিতে প্রায়শই জাতীয় মুক্তির জন্য ধর্ম, বর্ণ ও আঞ্চলিক ভেদাভেদ ভুলে ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়া হত।
  • অতীতের আদর্শায়ন: অনেক রচনায় ভারতের অতীতকে, বিশেষ করে ঔপনিবেশিক যুগের আগের সময়কালকে সমৃদ্ধি, জ্ঞান ও স্বশাসনের এক স্বর্ণালী যুগ হিসেবে তুলে ধরা হত, যা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে অনুভূত অবনতির সাথে বিপরীত চিত্র তৈরি করত।
  • জাতীয় প্রতীক ও আইকন তৈরি: সাহিত্য ও শিল্পকর্ম জাতীয় প্রতীক ও আইকন তৈরিতে অবদান রাখে যা জনগণকে অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ করতে পারত। ‘ভারতমাতা’ এমনই একটি আইকনিক উপস্থাপনার প্রধান উদাহরণ।
  • স্থানীয় ভাষার ব্যবহার: সাহিত্যে ও শিল্পকর্মে সচেতনভাবে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিজেই জাতীয় পরিচয়ের একটি দৃঢ়তা এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর একটি উপায় ছিল।
  • রাজনৈতিক কর্মের অনুপ্রেরণা: এই শৈল্পিক ও সাহিত্যিক অভিব্যক্তিগুলি প্রায়শই রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করত।

গুরুত্বপূর্ণ রচনা ও চিত্রে জাতীয়তাবাদের অন্তর্নিহিত চেতনা

১. আনন্দমঠ (বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

  • জাতীয়তাবাদী উপাদান: ১৮৮২ সালে প্রকাশিত ‘আনন্দমঠ’ একটি যুগান্তকারী রচনা যা শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগকে উদ্দীপিত করে।
    • দেশপ্রেমিক থিম: উপন্যাসটি সন্ন্যাসীদের একটি দলের চারপাশে আবর্তিত হয়েছে যারা অত্যাচারী মুসলিম শাসনের (ঐতিহাসিকভাবে ভুল কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের রূপক হিসেবে ব্যবহৃত) বিরুদ্ধে লড়াই করে। তাদের দেশমাতৃকার জন্য আত্মত্যাগ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটি শক্তিশালী রূপক হিসেবে কাজ করে।
    • “বন্দেমাতরম্”: আইকনিক গান “বন্দেমাতরম্”, যা পরবর্তীতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল, এই উপন্যাসের অংশ। এর পঙ্‌ক্তিগুলি মাতৃভূমিকে পূজা ও আত্মত্যাগের যোগ্য এক ঐশ্বরিক রূপে ব্যক্ত করে।
    • প্রতিরোধের আদর্শায়ন: উপন্যাসটি বিদেশী শাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য সশস্ত্র প্রতিরোধকে একটি বৈধ উপায় হিসেবে মহিমান্বিত করে।
    • ঐক্যের আহ্বান: যদিও ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপিত, মাতৃভূমির জন্য ঐক্য ও সম্মিলিত পদক্ষেপের অন্তর্নিহিত বার্তা তৎকালীন জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার সাথে গভীরভাবে অনুরণিত হয়েছিল।

২. বর্তমান ভারত (স্বামী বিবেকানন্দ)

  • জাতীয়তাবাদী উপাদান: ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘বর্তমান ভারত’ একটি শক্তিশালী প্রবন্ধ যা ভারতের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একটি দৃঢ় জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করে।
    • ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি গর্ব: বিবেকানন্দ ভারতের গৌরবময় বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের উপর জোর দেন, ভারতীয়দের তাদের সভ্যতা নিয়ে গর্ব করার আহ্বান জানান।
    • দুর্বলতার সমালোচনা: তিনি ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বিভাজনগুলির সমালোচনা করেন যা এটিকে বিদেশী শাসনের কাছে দুর্বল করে তুলেছিল, শক্তি, ঐক্য ও আত্মনির্ভরতার আহ্বান জানান।
    • পুনরুত্থিত ভারতের স্বপ্ন: প্রবন্ধটি একটি ভবিষ্যতের ভারতের স্বপ্ন উপস্থাপন করে যা তার জনগণের ক্ষমতায়ন এবং প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতা ও পাশ্চাত্যের অগ্রগতির সমন্বয়ের মাধ্যমে তার প্রাক্তন গৌরব ফিরে পাবে।
    • কর্মের আহ্বান: বিবেকানন্দের আবেগপূর্ণ গদ্য ভারতীয়দের তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এবং জাতীয় পুনর্জন্মের দিকে কাজ করার জন্য একটি আহ্বান হিসেবে কাজ করে।

৩. গোরা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

  • জাতীয়তাবাদী উপাদান: ১৯১০ সালে প্রকাশিত ‘গোরা’ ঔপনিবেশিক ভারতে পরিচয়, জাতীয়তাবাদ ও সমাজ সংস্কারের জটিল প্রশ্নগুলি অন্বেষণ করে।
    • সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের সমালোচনা: গভীরভাবে দেশপ্রেমিক হওয়া সত্ত্বেও, ঠাকুর ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে সংকীর্ণ ও বিভাজনমূলক জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করেন।
    • সার্বজনীনতার উপর জোর: উপন্যাসটি ভারতীয় পরিচয়ের একটি বৃহত্তর, আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে কথা বলে যা কৃত্রিম সীমানা অতিক্রম করে এবং সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধকে আলিঙ্গন করে।
    • সত্যিকারের পরিচয়ের সন্ধান: উপন্যাসের প্রধান চরিত্র গোরা, প্রাথমিকভাবে একজন কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী, তার বিদেশী বংশ পরিচয় আবিষ্কার করে, যা তার পরিচয় সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন তোলে এবং অনমনীয় সামাজিক ও জাতীয় বিভাজনগুলির কৃত্রিমতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
    • মানবতাবাদের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ: ‘গোরা’-য় ঠাকুরের জাতীয়তাবাদ গভীর মানবতাবাদের সাথে জড়িত, যা সামাজিক সংস্কার ও সমগ্র মানবতার ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়।

৪. ভারতমাতা (অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

  • জাতীয়তাবাদী উপাদান: প্রায় ১৯০৫ সালে নির্মিত ‘ভারতমাতা’ একটি আইকনিক চিত্র যা ভারতকে মাতৃরূপী রূপে ব্যক্ত করে।
    • মাতৃভূমি দেবী রূপে: চিত্রটিতে গেরুয়া বসন পরিহিত এক শান্ত মহিলাকে ভারতের মৌলিক চাহিদা – খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীকী বস্তু ধারণ করে থাকতে দেখা যায়। এটি মাতৃভূমিকে পূজা ও সম্মানের যোগ্য দেবীরূপে উন্নীত করে।
    • জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক: ‘ভারতমাতা’ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের একটি শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়, যা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও shared পরিচয়ের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
    • শান্তিপূর্ণ ও আধ্যাত্মিক উপস্থাপনা: জাতীয়তাবাদের আরও জঙ্গি উপস্থাপনার বিপরীতে, অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতমাতা’ জাতির আধ্যাত্মিক ও লালন-পালনের দিকগুলির উপর জোর দেয়।
    • জাতীয়তাবাদী চিত্রকলার উপর প্রভাব: এই চিত্রকর্মটি পরবর্তীকালের জাতীয়তাবাদী শিল্প ও চিত্রকলার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, ভারত কীভাবে দৃশ্যত উপস্থাপিত হবে তা shaping করে।

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রে ঔপনিবেশিক সমাজের সমালোচনা

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র, ছিলেন একজন অগ্রণী কার্টুনিস্ট যিনি বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাংলায় ঔপনিবেশিক সমাজের বিভিন্ন দিককে ব্যঙ্গাত্মক চিত্রের মাধ্যমে সমালোচনা করতেন। তাঁর ব্যঙ্গচিত্রগুলি ব্রিটিশ শাসনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের উপর একটি তীক্ষ্ণ এবং প্রায়শই হাস্যরসাত্মক ভাষ্য প্রদান করে:

  • আমলাতান্ত্রিক অযৌক্তিকতা: তাঁর অনেক কার্টুন ভারতে ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনের প্রায়শই অযৌক্তিক ও সংবেদনহীন প্রকৃতিকে ব্যঙ্গ করে। তিনি কর্মকর্তাদের দাম্ভিক, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ভারতীয় জনগণের কল্যাণের চেয়ে তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার বিষয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হিসেবে চিত্রিত করেছেন।
  • পশ্চিমাভিমুখিতা ও তার অসন্তোষ: গগনেন্দ্রনাথ প্রায়শই ভারতীয় অভিজাত শ্রেণীর কিছু অংশের অন্ধভাবে পশ্চিমা রীতিনীতি অনুকরণকে ব্যঙ্গ করতেন। তাঁর ব্যঙ্গচিত্রগুলি পশ্চিমা রীতির নির্বিচারে গ্রহণের ফলে সৃষ্ট অগভীরতা ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাকে তুলে ধরে।
  • সামাজিক hierarchy ও শ্রেণী বিভাজন: তাঁর কাজ ঔপনিবেশিক সমাজে বিদ্যমান কঠোর সামাজিক hierarchy-র সমালোচনা করে, যা প্রায়শই ব্রিটিশ শাসক শ্রেণীর উপস্থিতির কারণে আরও তীব্র হত। তিনি ক্ষমতাশালীদের ঔদ্ধত্য এবং প্রান্তিকদের দুর্দশাকে ব্যঙ্গ করতেন।
  • রাজনৈতিক ভণ্ডামি: তাঁর কিছু কার্টুন সূক্ষ্মভাবে বা স্পষ্টভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের রাজনৈতিক ভণ্ডামির উপর মন্তব্য করে, অগ্রগতি আনার তাদের দাবির সাথে নিপীড়ন ও শোষণের বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরে।
  • সাংস্কৃতিক সংঘাত: গগনেন্দ্রনাথের ব্যঙ্গচিত্রগুলি প্রায়শই পশ্চিমা ও ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যে অদ্ভুত এবং কখনও কখনও হাস্যকর সংঘাতগুলিকে চিত্রিত করে, ঔপনিবেশিক encounters-এর অন্তর্নিহিত উত্তেজনা ও ক্ষমতার গতিশীলতা প্রকাশ করে।
  • উদ্ভাবনী কৌশলের ব্যবহার: তাঁর অনন্য শৈলী, প্রায়শই কিউবিজম এবং অন্যান্য আধুনিক শিল্প আন্দোলনের উপাদানগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাঁর ব্যঙ্গাত্মক ভাষ্যের পরিশীলিততা ও চাক্ষুষ প্রভাব যোগ করে।

 

Scroll to Top