বিষয়বস্তু: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম মূলত কৃষকদের সংগ্রামের সাথে গভীরভাবে জড়িত ছিল, কারণ তারাই ছিল জনসংখ্যার একটি বড় অংশ। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির সাথে কৃষকদের সংগঠিত করা এবং তাদের অভিযোগগুলি সমাধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এই আলোচনায়, বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন, অহিংস অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান পর্বগুলিতে এই রাজনৈতিক শক্তি এবং কৃষক আন্দোলনের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হবে। এছাড়াও, একা আন্দোলন ও বারদৌলি সত্যাগ্রহের মতো কৃষক আন্দোলনের বিশেষ দিকগুলিও সংক্ষিপ্তভাবে আলোচিত হবে।
কংগ্রেস, বামপন্থী ও কৃষক আন্দোলনের পারস্পরিক সম্পর্ক
ভারতের কৃষক আন্দোলনগুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং স্বাধীনতা সংগ্রামের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, প্রাথমিকভাবে নরমপন্থী নেতাদের দ্বারা প্রভাবিত হলেও, ধীরে ধীরে কৃষক আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করে। শ্রেণী সংগ্রামের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বামপন্থী দলগুলিও কৃষক আন্দোলন সংগঠিত এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- সাধারণ অভিযোগ: কংগ্রেস এবং বামপন্থী উভয় দলই কৃষকদের সাধারণ অভিযোগগুলি উপলব্ধি করেছিল, যার মধ্যে উচ্চ ভূমি রাজস্বের দাবি, অত্যাচারী জমিদার এবং মহাজনদের দ্বারা শোষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- সংগঠন ও আন্দোলন: এই রাজনৈতিক শক্তিগুলি কৃষকদের সংগঠিত করা, কৃষক সংগঠন তৈরি করা এবং তাদের দাবিগুলি তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- রাজনৈতিক চেতনা: কৃষক আন্দোলন গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধিতে অবদান রাখে, যা তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিতে সক্ষম করে।
- ভিন্ন মতাদর্শ: কংগ্রেস এবং বামপন্থী উভয় দলই কৃষকদের সমর্থন করলেও, তাদের মতাদর্শ এবং দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন ছিল। কংগ্রেস প্রায়শই কৃষক সংগ্রামগুলিকে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিল, যেখানে বামপন্থীরা শ্রেণী সংগ্রাম এবং আমূল ভূমি সংস্কারের উপর জোর দিয়েছিল।
স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান পর্বগুলিতে কৃষক আন্দোলন
১. বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন (১৯০৫-১৯১১)
- কৃষকদের অংশগ্রহণ: ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়, যার মধ্যে কৃষকদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল।
- অর্থনৈতিক অভিযোগ: পূর্ববঙ্গের কৃষকরা, মূলত মুসলমান, বঙ্গভঙ্গের কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কারণ এটি জমিদারী এবং মহাজনী সংক্রান্ত তাদের অর্থনৈতিক অভিযোগগুলিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
- কংগ্রেসের নেতৃত্ব: কংগ্রেস কৃষকদের সংগঠিত করে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়, যা তাদের জীবিকার উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছিল।
- প্রাথমিক সংগঠন: বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনে কৃষক সংগঠনের প্রাথমিক রূপ দেখা যায়, বিশেষত বাংলার গ্রামীণ অঞ্চলে।
২. অহিংস অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-১৯২২)
- কৃষক বিদ্রোহ: অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে ভারতের বিভিন্ন অংশে, যেমন অযোধ্যা (উত্তরপ্রদেশ) এবং মোপলা (কেরল) তে ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহ দেখা যায়।
- কংগ্রেসের সমর্থন: মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস কৃষক অভিযোগগুলিকে বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা করে।
- অযোধ্যা কিষাণ সভা: বাবা রামচন্দ্রের নেতৃত্বে অযোধ্যা কিষাণ সভা অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে, খাজনা কমানোর দাবি এবং জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ করার দাবি জানায়।
- মোপলা বিদ্রোহ: কেরলের মোপলা বিদ্রোহ, প্রাথমিকভাবে কৃষক অভিযোগের উপর ভিত্তি করে শুরু হলেও, সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়, যা কৃষক আন্দোলনের জটিলতা তুলে ধরে।
৩. আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-১৯৩৪)
- কৃষি অসন্তোষ: আইন অমান্য আন্দোলন মহামন্দার কারণে তীব্র কৃষি অসন্তোষের সাথে মিলে যায়।
- খাজনা বন্ধ আন্দোলন: কংগ্রেস বিভিন্ন অঞ্চলে খাজনা বন্ধ আন্দোলন শুরু করে, যা উচ্চ ভূমি রাজস্বের দাবির বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে।
- কৃষকদের উপর প্রভাব: এই আন্দোলন কৃষকদের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল, বিশেষত গুজরাট (বারদৌলি সত্যাগ্রহ) এবং উত্তরপ্রদেশে, যেখানে তারা সক্রিয়ভাবে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল।
- বামপন্থীদের প্রভাব: এই সময় বামপন্থী নেতা ও সংগঠনগুলি কৃষক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
৪. ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২)
- ব্যাপক অংশগ্রহণ: ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কৃষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায়, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে।
- গোপন প্রতিরোধ: কৃষকরা গোপন প্রতিরোধ কার্যকলাপে যুক্ত ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করে, সরকারি ভবন আক্রমণ করে এবং সমান্তরাল সরকার গঠন করে।
- স্থানীয় বিদ্রোহ: মহারাষ্ট্রের সাতারা প্রতি সরকার এবং বাংলার তমলুক জাতীয় সরকারের মতো স্থানীয় বিদ্রোহ আন্দোলনে কৃষকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রদর্শন করে।
- বামপন্থীদের ভিন্ন অবস্থান: উল্লেখযোগ্যভাবে, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) প্রাথমিকভাবে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল, এটিকে বুর্জোয়া-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন হিসেবে দেখে, যা ফ্যাসিবাদ-বিরোধী মিত্রশক্তির যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে বাধা দেবে। এই কারণে, এই গুরুত্বপূর্ণ পর্বে কৃষক আন্দোলনে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়।
প্রধান কৃষক আন্দোলন
১. একা আন্দোলন (১৯২১-১৯২২)
- অঞ্চল: মূলত সংযুক্ত প্রদেশে (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ) সক্রিয় ছিল।
- কারণ: একা (ঐক্য) আন্দোলন জমিদার ও সরকারের অত্যাচারী নীতির বিরুদ্ধে কৃষক বিদ্রোহ ছিল, যার মধ্যে উচ্চ খাজনা, অবৈধ আদায় এবং জোরপূর্বক শ্রম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- নেতৃত্ব: কিছু স্থানীয় নেতা থাকলেও, এই আন্দোলনে মূলত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাব ছিল।
- বৈশিষ্ট্য: কৃষকরা শোষণ প্রতিরোধের জন্য ঐক্য ও সম্মিলিত পদক্ষেপের শপথ নেয়। এই আন্দোলন অহিংস প্রতিরোধ পদ্ধতি ব্যবহার করে, তবে মাঝে মাঝে জমিদার ও কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘর্ষও ঘটে।
- গুরুত্ব: একা আন্দোলন অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে ব্যাপক কৃষি অসন্তোষ এবং কৃষকদের সংগঠিত হয়ে তাদের অধিকারের জন্য লড়াই করার ইচ্ছাকে তুলে ধরে।
২. বারদৌলি সত্যাগ্রহ (১৯২৮)
- অঞ্চল: গুজরাটের বারদৌলি তালুক।
- কারণ: বারদৌলি সত্যাগ্রহ ছিল বম্বে প্রেসিডেন্সি সরকার কর্তৃক ৩০% ভূমি রাজস্ব বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
- নেতৃত্ব: সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এই আন্দোলনে শক্তিশালী নেতৃত্ব দেন, যার জন্য তিনি “সর্দার” উপাধি পান।
- বৈশিষ্ট্য: এই আন্দোলন সুশৃঙ্খল অহিংস প্রতিরোধের দ্বারা চিহ্নিত ছিল, যার মধ্যে বর্ধিত রাজস্ব দিতে অস্বীকার, সরকারি কর্মকর্তাদের সামাজিক বয়কট এবং সংগঠিত প্রতিবাদ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
- গুরুত্ব: বারদৌলি সত্যাগ্রহ কৃষকদের জন্য একটি দুর্দান্ত সাফল্য ছিল। সরকার রাজস্ব বৃদ্ধি কমাতে বাধ্য হয় এবং এটি শক্তিশালী নেতৃত্বের অধীনে সংগঠিত অহিংস প্রতিরোধের কার্যকারিতা তুলে ধরে। এটি জাতীয় নেতা হিসেবে প্যাটেলের মর্যাদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।