বিষয়বস্তু: বিংশ শতাব্দীতে ভারতে দলিত রাজনীতি ও আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ বিকাশ ঘটে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দীর সামাজিক নিপীড়ন এবং সমতা ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা দ্বারা চালিত হয়েছিল। এই আলোচনায় এই আন্দোলনগুলির চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ করা হবে, দলিত অধিকার বিষয়ে মহাত্মা গান্ধী ও ডঃ বি.আর. আম্বেদকরের মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক এবং প্রসঙ্গক্রমে বাংলার প্রভাবশালী নমঃশূদ্র আন্দোলন সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে।
বিশ শতকের ভারতে দলিত আন্দোলনের চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ
‘দলিত’ শব্দটি, যার অর্থ ‘ভাঙা’ বা ‘নিপীড়িত’, ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু বর্ণ ব্যবস্থার মধ্যে অস্পৃশ্যতা ও সামাজিক exclusion-এর শিকার বিভিন্ন সম্প্রদায়কে বোঝায়। বিংশ শতাব্দী ছিল তাদের মুক্তির জন্য সংগ্রামকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা ও সংগঠিত করার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল। দলিত আন্দোলনের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণগুলি নিম্নরূপ:
- বর্ণ-বিরোধী সংগ্রাম: এই আন্দোলনগুলির মৌলিক প্রকৃতি ছিল জাতিভেদ প্রথার, বিশেষ করে অস্পৃশ্যতার প্রথার সরাসরি বিরোধিতা।
- সমতা ও মর্যাদার দাবি: দলিতরা তাদের সমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মর্যাদার অধিকারের উপর জোর দিয়েছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দীর অপমান ও প্রান্তিকতার অবসান দাবি করে।
- আত্ম-প্রতিষ্ঠা ও পরিচয় গঠন: এই আন্দোলনগুলি দলিতদের মধ্যে একটি সম্মিলিত পরিচয় ও আত্মসম্মানের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, তাদের উপর চাপানো অপমানজনক লেবেলগুলিকে প্রত্যাখ্যান করে। তারা তাদের আদিবাসী শিকড় প্রতিষ্ঠা করতে এবং ব্রাহ্মণবাদী সামাজিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ‘আদি-দ্রাবিড়’, ‘আদি-হিন্দু’ এবং ‘নমঃশূদ্র’-এর মতো বিকল্প পরিচয় গ্রহণ করে।
- বিচিত্র কৌশল: দলিত আন্দোলনগুলি সামাজিক সংস্কার, শিক্ষাগত ক্ষমতায়ন, রাজনৈতিক সংগঠন, আইনি সক্রিয়তা ও সাংস্কৃতিক আত্মপ্রতিষ্ঠা সহ বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে।
- নেতৃত্ব ও সংগঠন: ডঃ বি.আর. আম্বেদকরের মতো শক্তিশালী নেতাদের উত্থান এবং অল ইন্ডিয়া ডিপ্রেসড ক্লাসেস অ্যাসোসিয়েশন ও শিডিউলড কাস্টস ফেডারেশনের মতো সংগঠনের গঠন আন্দোলনগুলিকে দিকনির্দেশনা ও কাঠামো প্রদান করে।
- রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের উপর জোর: সামাজিক ন্যায়বিচার অর্জনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার গুরুত্ব উপলব্ধি করে, দলিত আন্দোলনের একটি প্রধান দাবি ছিল আইনসভা ও সরকারি চাকরিতে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব।
- মতাদর্শের প্রভাব: এই আন্দোলনগুলি জ্যোতিবা ফুলের মতো পূর্ববর্তী সংস্কারকদের বর্ণ-বিরোধী দর্শন, সমাজতান্ত্রিক ধারণা এবং আম্বেদকরের নিজস্ব অনন্য সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।
দলিত অধিকার বিষয়ে গান্ধি-আম্বেদকর বিতর্ক
বিংশ শতাব্দীর ভারতের দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মহাত্মা গান্ধী ও ডঃ বি.আর. আম্বেদকর দলিত অধিকার ও অস্পৃশ্যতা বিলোপের বিষয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। তাদের বিতর্ক, যদিও কখনও কখনও তীব্র ছিল, ভারতে সামাজিক ন্যায়বিচারের আলোচনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল:
- গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গি: হিন্দু ধর্মের অভ্যন্তরে সংস্কার: গান্ধী অস্পৃশ্যতাকে একটি সামাজিক কুপ্রথা এবং হিন্দু ধর্মের উপর একটি “কলঙ্ক” হিসেবে দেখতেন। তিনি দলিতদের (যাদের তিনি ‘হরিজন’ বা ‘ঈশ্বরের সন্তান’ বলতেন) নৈতিক প্ররোচনা এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের হৃদয় পরিবর্তনের মাধ্যমে হিন্দু সমাজের মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ছিলেন। তিনি বর্ণ ব্যবস্থাকে তার আদর্শায়িত রূপে শ্রমের বিভাজন হিসেবে রেখে অস্পৃশ্যতা দূর করে সংস্কার করতে বিশ্বাস করতেন।
- আম্বেদকরের দৃষ্টিভঙ্গি: জাতিভেদ প্রথার উচ্ছেদ: আম্বেদকর, যিনি একটি ‘অস্পৃশ্য’ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং জাতি বৈষম্যের নির্মম বাস্তবতার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, জাতিভেদ প্রথাকে মৌলিকভাবে নিপীড়নমূলক ও বৈষম্যমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে অস্পৃশ্যতা কেবল একটি সামাজিক কুপ্রথা নয়, বরং হিন্দু ধর্মগ্রন্থ ও সামাজিক কাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি দলিতদের জন্য সত্যিকারের সমতা অর্জনের একমাত্র উপায় হিসেবে জাতিভেদ প্রথার সম্পূর্ণ উচ্ছেদের পক্ষে ছিলেন।
- পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা: বিতর্কের একটি প্রধান বিষয় ছিল দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার প্রশ্ন। আম্বেদকর দলিতদের জন্য সত্যিকারের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন, যা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রভাবমুক্ত থাকবে। গান্ধী এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, কারণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে এটি হিন্দু সমাজকে আরও খণ্ডিত করবে।
- পুনা চুক্তি (১৯৩২): ১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচন মঞ্জুর করার সাথে সাথে বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। গান্ধী এর প্রতিবাদে আমরণ অনশন শুরু করেন। অবশেষে, পুনা চুক্তির মাধ্যমে আম্বেদকর একটি যৌথ নির্বাচনের মধ্যে দলিতদের জন্য বৃহত্তর সংখ্যক সংরক্ষিত আসনের বিনিময়ে পৃথক নির্বাচনের দাবি ত্যাগ করতে সম্মত হন।
- সামাজিক উন্নয়নে ভিন্ন মত: গান্ধী উচ্চবর্ণের হিন্দুদের নেতৃত্বে নৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সংস্কারের উপর জোর দিয়েছিলেন, যেখানে আম্বেদকর দলিতদের জন্য আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গিকে পিতৃতান্ত্রিক ও জাতিগত নিপীড়নের গভীরভাবে প্রোথিত ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার জন্য অপর্যাপ্ত বলে মনে করতেন।
বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলন
বাংলার নমঃশূদ্র আন্দোলন সামাজিক নিপীড়নের প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক গতিশীলতা ও স্বীকৃতির অনুসন্ধানের একটি জোরালো উদাহরণ।
- সামাজিক পটভূমি: নমঃশূদ্ররা, পূর্বে ‘চণ্ডাল’ নামে পরিচিত, পূর্ব ও মধ্যবঙ্গের একটি বৃহৎ কৃষিভিত্তিক সম্প্রদায় ছিল, যাদের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা ‘অস্পৃশ্য’ বলে গণ্য করত। তারা তীব্র সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্যের শিকার ছিল।
- আন্দোলনের উত্থান: নমঃশূদ্র আন্দোলন উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে গতি লাভ করে, যার চালিকাশক্তি ছিল তাদের সামাজিক অবস্থার উন্নতি ও উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকদের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা।
- প্রধান নেতা ও সংগঠন: মতুয়া সম্প্রদায়ের হরিচাঁদ ঠাকুর ও তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর নমঃশূদ্র সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯১২ সালে গঠিত ‘অল বেঙ্গল নমঃশূদ্র অ্যাসোসিয়েশন’ তাদের দাবিগুলি তুলে ধরার একটি প্রধান প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে।
- দাবি ও কৌশল: আন্দোলন সামাজিক সমতা, মর্যাদা, শিক্ষা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধাগুলিতে প্রবেশাধিকার এবং বৈষম্যমূলক প্রথার অবসানের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিল। তারা সামাজিক বয়কট, ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন এবং একটি স্বতন্ত্র নমঃশূদ্র পরিচয় প্রতিষ্ঠার মতো বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে। আন্দোলন ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষা ও স্ব-সংগঠনের উপরও জোর দেয়।
- প্রভাব ও উত্তরাধিকার: নমঃশূদ্র আন্দোলন সম্প্রদায়ের সামাজিক চেতনা বৃদ্ধিতে এবং কিছু পরিমাণে সামাজিক গতিশীলতা ও স্বীকৃতি অর্জনে সফল হয়েছিল। তারা ঔপনিবেশিক বাংলার রাজনৈতিক প্রক্রিয়াগুলিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে তাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি প্রদর্শন করে। এই আন্দোলনের উত্তরাধিকার আজও পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের দলিত রাজনীতিকে প্রভাবিত করে।
বিংশ শতাব্দীর দলিত আন্দোলনের বিশ্লেষণ
বিংশ শতাব্দীর দলিত আন্দোলনগুলি নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল:
- জাতিভেদ প্রথাকে চ্যালেঞ্জ: তারা জাতি বৈষম্যের বিষয়টিকে জাতীয় চেতনার forefront-এ নিয়ে আসে এবং এর বৈধতাকে সক্রিয়ভাবে চ্যালেঞ্জ করে।
- দলিতদের ক্ষমতায়ন: এই আন্দোলনগুলি দলিতদের মধ্যে আত্মমর্যাদা ও আত্মসম্মানের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, যা তাদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে সক্ষম করে।
- আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা অর্জন: দলিত নেতা ও আন্দোলনগুলির নিরলস প্রচেষ্টা, বিশেষ করে ভারতীয় সংবিধান প্রণয়নে আম্বেদকরের ভূমিকা অস্পৃশ্যতা বিলোপ ও সংরক্ষণ নীতি বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত করে।
- সামাজিক ন্যায়বিচার প্রচার: দলিত আন্দোলনগুলি ভারতে সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতার জন্য চলমান সংগ্রামে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
- ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত: বিংশ শতাব্দীর দলিত আন্দোলনগুলির সংগ্রাম ও অর্জনগুলি সমসাময়িক দলিত সক্রিয়তা ও জাতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।