পরিবেশ দূষণ – শব্দ দূষণের কারণ এবং প্রভাব

ভূমিকা

শব্দ দূষণ আধুনিক নগর জীবনের একটি গুরুতর সমস্যা যা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এটি মূলত অতিরিক্ত ও অবাঞ্ছিত শব্দের কারণে ঘটে, যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

 

শব্দ দূষণের সংজ্ঞা

শব্দ দূষণ হল পরিবেশে অনাকাঙ্ক্ষিত বা মাত্রাতিরিক্ত শব্দের উপস্থিতি, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও বাস্তুতন্ত্রের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সাধারণত, ৭৫ ডেসিবেলের (dB) বেশি মাত্রার শব্দ ক্ষতিকারক হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

শব্দ দূষণের প্রধান কারণসমূহ

নগরায়ণ ও আধুনিক সভ্যতার বিকাশের ফলে শব্দ দূষণের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিচে শব্দ দূষণের কিছু প্রধান কারণ ব্যাখ্যা করা হলো:

 

১. যানবাহনের শব্দ

বাইক, বাস, ট্রাক, ট্রেন এবং বিমানের ইঞ্জিনের উচ্চ শব্দ শহরাঞ্চলে শব্দ দূষণের প্রধান কারণ। যানবাহনের হর্ন এবং ব্রেকের শব্দও এর মাত্রা বাড়িয়ে তোলে।

২. কলকারখানা ও নির্মাণকাজ

শিল্প কারখানার মেশিন, নির্মাণ কাজের ড্রিলিং, কাটিং, ওelding ইত্যাদি কার্যক্রম থেকে উচ্চমাত্রার শব্দ উৎপন্ন হয়, যা পরিবেশকে দূষিত করে।

৩. উচ্চ শব্দে মাইক ও লাউডস্পিকার ব্যবহার

বিবাহ, রাজনৈতিক সভা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে উচ্চস্বরে মাইক ও লাউডস্পিকার ব্যবহারের ফলে শব্দ দূষণ ঘটে।

৪. আতশবাজি ও পটকা ফাটানো

উৎসব বা বিশেষ অনুষ্ঠানে পটকা ফাটানোর ফলে হঠাৎ তীব্র শব্দের সৃষ্টি হয়, যা মানুষের শ্রবণশক্তির উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

৫. গৃহস্থালি ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি

টেলিভিশন, রেডিও, ব্লেন্ডার, মিক্সার, মাইক্রোওভেন এবং এয়ার কন্ডিশনারের মতো গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি থেকেও শব্দ দূষণ হয়, বিশেষত যখন এগুলি দীর্ঘক্ষণ চালু থাকে।

 

শব্দ দূষণের প্রধান প্রভাবসমূহ

শব্দ দূষণ কেবল অস্বস্তিকর নয়, এটি মানুষের শরীর ও মানসিক অবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। নিচে এর কিছু প্রধান প্রভাব আলোচনা করা হলো:

 

১. শ্রবণশক্তি হ্রাস

উচ্চমাত্রার শব্দ দীর্ঘ সময় ধরে শুনলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ৮৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দে নিয়মিত অবস্থান করলে শ্রবণশক্তির স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

২. অনিদ্রা ও ঘুমের ব্যাঘাত

শব্দ দূষণ ঘুমের সমস্যা তৈরি করে, যা অনিদ্রা, ক্লান্তি এবং মনোযোগের অভাবের কারণ হতে পারে।

৩. মানসিক চাপ ও উদ্বেগ

অতিরিক্ত শব্দের কারণে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মাত্রা বেড়ে যায়।

৪. উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি

গবেষণায় দেখা গেছে যে, উচ্চমাত্রার শব্দে দীর্ঘসময় থাকার ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।

৫. প্রাণিকুলের উপর প্রভাব

শব্দ দূষণ শুধু মানুষের জন্যই নয়, পশুপাখির জন্যও ক্ষতিকর। উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে পাখি ও বন্যপ্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন অনুভব করে, যা প্রজনন ও বেঁচে থাকার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।

 

উপসংহার

শব্দ দূষণ একটি গুরুতর পরিবেশগত সমস্যা যা মানুষের স্বাস্থ্য ও প্রাণিজগতের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজের নিয়ম মেনে চলা, সাউন্ডপ্রুফ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। শব্দ দূষণ প্রতিরোধে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েরই ভূমিকা পালন করা উচিত।

 

Scroll to Top