ভূমিকা
জল দূষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা, যা জলজ পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন মানব কার্যকলাপের ফলে জলাশয়গুলি দূষিত হয়ে পড়ে, যা পানযোগ্যতার উপযুক্ত থাকে না এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রবন্ধে জল দূষণের মূল কারণগুলি, বিশেষ করে DDT, BHC এবং ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication)-এর প্রভাবগুলি বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে শৈবাল বৃদ্ধির (Algal Bloom) সমস্যা ও মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর মৃত্যু।
জল দূষণের কারণ
১. DDT (ডাইক্লোরোডাইফেনাইলট্রাইক্লোরোইথেন) এর ব্যবহার
DDT একটি কৃত্রিম কীটনাশক যা কৃষিকাজে এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। তবে অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এটি কৃষিক্ষেত্র থেকে জলে প্রবাহিত হয়ে জল দূষণের কারণ হয়।
- পরিবেশে দীর্ঘস্থায়ীতা: DDT সহজে ভাঙে না এবং দীর্ঘ সময় ধরে জলে থেকে যায়।
- জৈব সঞ্চয় ও জৈব প্রবৃদ্ধি: এটি খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে প্রাণীদের শরীরে জমা হয়।
- জলজ প্রাণীর উপর বিষাক্ত প্রভাব: DDT-এর উচ্চ মাত্রা প্রজননে সমস্যা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে।
২. BHC (বেনজিন হেক্সাক্লোরাইড) এর ব্যবহার
DDT-র মতো BHC-ও একটি অর্গানো-ক্লোরিন কীটনাশক যা কৃষি ও জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত হয়। এটি কৃষিক্ষেত্র ও শিল্প বর্জ্যের মাধ্যমে জলে পৌঁছে দূষণ ঘটায়।
- দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: BHC-র অবশিষ্টাংশ দীর্ঘদিন জলে থাকে ও প্রাণীদের ক্ষতি করে।
- মাছ ও উভচর প্রাণীদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব: BHC-তে সংস্পর্শে এলে বিকৃতি, আচরণগত পরিবর্তন এবং মৃত্যু ঘটতে পারে।
- মানব স্বাস্থ্যের ঝুঁকি: দূষিত জল পান করলে স্নায়ুবিক ও যকৃত-সংক্রান্ত রোগ হতে পারে।
৩. ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication)
ইউট্রোফিকেশন হল নাইট্রোজেন ও ফসফরাস জাতীয় অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদানে জলের সমৃদ্ধি, যা মূলত সার, পয়ঃপ্রবাহ ও শিল্পবর্জ্য থেকে আসে। এর ফলে শৈবাল দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
- অক্সিজেনের ঘাটতি: অতিরিক্ত শৈবালের পচনে জলে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায়, যা মাছ ও অন্যান্য প্রাণীকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে।
- খাদ্য শৃঙ্খলে বিঘ্ন: প্রাকৃতিক খাদ্যচক্রের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং কিছু প্রজাতি বিলুপ্ত হতে পারে।
- বিষাক্ত পদার্থের সৃষ্টি: কিছু শৈবাল ক্ষতিকর বিষ ছেড়ে দেয়, যা প্রাণী ও মানুষের জন্য বিপজ্জনক।
জল দূষণের প্রভাব
১. শৈবাল বৃদ্ধির সমস্যা (Algal Bloom)
পুষ্টি উপাদানে সমৃদ্ধ জল শৈবাল বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, যার ফলে বিভিন্ন পরিবেশগত সমস্যা দেখা যায়।
- সূর্যালোকের বাধা: ঘন শৈবালের স্তর জলের নিচে আলো প্রবেশ করতে দেয় না, যার ফলে জলজ উদ্ভিদের ফটোসিনথেসিস বাধাগ্রস্ত হয়।
- বিষাক্ত পদার্থের উৎপাদন: কিছু শৈবাল বিষাক্ত যৌগ ছাড়ে, যা মাছ, প্রাণী ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর।
- জলের গুণমান নষ্ট: শৈবাল বৃদ্ধির ফলে জল দুর্গন্ধযুক্ত ও পান ও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে ওঠে।
২. মাছ ও জলজ প্রাণীর মৃত্যু
জল দূষণের ফলে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে।
- অক্সিজেনের ঘাটতি: দূষিত পদার্থ ও শৈবালের অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণে জলে অক্সিজেন কমে যায়, ফলে প্রাণীরা মারা যায়।
- বিষাক্ত রাসায়নিকের সঞ্চয়: DDT ও BHC মাছের শরীরে জমা হয়ে মৃত্যু ও প্রজননে ব্যর্থতা ঘটায়।
- আবাসস্থল ধ্বংস: দূষিত জল প্রাণীদের প্রজনন ক্ষেত্র ও বাসস্থানকে ধ্বংস করে এবং প্রাকৃতিক গতিবিধিতে বিঘ্ন ঘটায়।
উপসংহার
DDT ও BHC-এর মতো ক্ষতিকর কীটনাশক এবং ইউট্রোফিকেশনের কারণে জল দূষণ জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর ভয়ানক প্রভাব ফেলছে। শৈবাল বৃদ্ধির সমস্যা ও মাছের গণমৃত্যু এই দূষণের ভয়াবহ দিক তুলে ধরে। তাই দূষণ রোধে টেকসই কৃষি পদ্ধতি, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কঠোর পরিবেশ আইন প্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুস্থ ও নিরাপদ জল সংরক্ষণ করা যায়।