ভূমিকা
চার্লস ডারউইন ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত On the Origin of Species গ্রন্থে বিবর্তন তত্ত্ব বা ডারউইনিজম উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে কিভাবে জীবজগত প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়।
ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের প্রধান উপাদানগুলি হল – অতিরিক্ত জনন, অস্তিত্বের সংগ্রাম, প্রকরণের (variation) উদ্ভব, যোগ্যতমের টিকে থাকা, প্রাকৃতিক নির্বাচন ও নতুন প্রজাতির উৎপত্তি।
এই অধ্যায়ে আমরা এই মূল নীতিগুলি বিশদে আলোচনা করব।
১. অতিরিক্ত জনন (Prodigality of Production)
প্রতিটি জীবের প্রাকৃতিক প্রবণতা থাকে অধিক সংখ্যায় বংশবৃদ্ধি করার, কিন্তু সমস্ত জীব বাঁচতে পারে না, কারণ পরিবেশগত ও সম্পদগত সীমাবদ্ধতা থাকে।
উদাহরণ:
- একজোড়া হাতি তাদের জীবদ্দশায় ৪-৬টি শাবক জন্ম দিতে পারে, কিন্তু যদি সমস্ত শাবক বেঁচে থাকত তবে পৃথিবী হাতিতে ভরে যেত।
- কোড মাছ প্রতি বার লক্ষাধিক ডিম পাড়ে, কিন্তু তার মধ্যে খুব কম সংখ্যক বেঁচে থাকে।
| প্রাণী | প্রজননের সংখ্যা | বেঁচে থাকার হার |
| কোড মাছ | ~১০ লক্ষ ডিম | খুব কম |
| হাতি | ৪-৬টি শাবক | বেশি |
| গৃহমাছি | ~৫০০টি ডিম | মাঝারি |
এই অতিরিক্ত জনন নিশ্চিত করে যে কিছু সংখ্যালঘু জীব বেঁচে থাকবে এবং প্রজাতি টিকে থাকবে।
২. খাদ্য ও আশ্রয়ের স্থিরতা (Constancy of Food and Shelter)
যদিও জীবজগত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে, তবুও খাদ্য, আশ্রয় এবং অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ সীমিত থাকে। এটি প্রতিযোগিতার (competition) সৃষ্টি করে।
মূল পর্যবেক্ষণ:
- খাদ্য, পানি, স্থান, সূর্যালোকের পরিমাণ সীমিত।
- প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে জনসংখ্যা স্থিতিশীল থাকে।
- এই সীমাবদ্ধতা অস্তিত্বের সংগ্রামের সৃষ্টি করে।
৩. অস্তিত্বের সংগ্রাম (Struggle for Existence)
সীমিত সম্পদের কারণে প্রতিটি জীবকে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হয়। এই প্রতিযোগিতা তিন ধরনের হতে পারে:
| সংগ্রামের ধরন | বর্ণনা | উদাহরণ |
| আন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম | একই প্রজাতির মধ্যে প্রতিযোগিতা | দুটি হরিণ খাবারের জন্য লড়াই করছে |
| অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম | বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে প্রতিযোগিতা | সিংহ ও হায়েনার মধ্যে খাদ্যের প্রতিযোগিতা |
| পরিবেশগত সংগ্রাম | প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে সংগ্রাম | মরুভূমিতে ক্যাকটাসের বেঁচে থাকা |
এই সংগ্রাম নিশ্চিত করে যে কেবলমাত্র সবচেয়ে উপযুক্ত জীবগুলিই বেঁচে থাকে।
৪. প্রকরণ (Variation)
একই প্রজাতির সমস্ত জীব একই রকম নয়, কারণ তাদের মধ্যে কিছু বৈচিত্র্য (variation) থাকে। এই বৈচিত্র্য জন্মগত বা পরিবেশগত হতে পারে।
প্রকরণের ধরণ:
| ধরণ | বর্ণনা | উদাহরণ |
| বংশগত প্রকরণ | পিতামাতার থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত | চোখের রঙ, উচ্চতা, ত্বকের রঙ |
| অর্জিত প্রকরণ | জীবদ্দশায় পরিবেশগত কারণে গঠিত | শরীরচর্চার ফলে শক্তিশালী পেশী |
প্রকরণ বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কারণ এটি কিছু জীবকে পরিবেশের সাথে আরও ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।
৫. যোগ্যতমের টিকে থাকা (Survival of the Fittest)
সমস্ত জীব বেঁচে থাকতে পারে না। কেবলমাত্র যাদের বৈশিষ্ট্য উপযোগী, তারাই টিকে থাকে এবং বংশবিস্তার করে। এই ধারণাকে “Survival of the Fittest” বলা হয়।
উদাহরণ:
- লম্বা গলার জিরাফ গাছে উচ্চ শাখা থেকে খাবার সংগ্রহ করতে পেরেছিল, কিন্তু ছোট গলার জিরাফ না পেরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
- রঙ পরিবর্তনকারী পতঙ্গ নিজেদের পরিবেশের সাথে মিলিয়ে ফেলে, ফলে তারা শিকারিদের হাত থেকে রক্ষা পায়।
শুধুমাত্র উপযুক্ত বৈশিষ্ট্যযুক্ত প্রাণীরাই বংশবৃদ্ধি করতে পারে, ফলে প্রজাতি পরিবর্তিত হয়।
৬. প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection)
প্রকৃতি এমন জীবদের নির্বাচন করে, যারা পরিবেশের সাথে সর্বাধিক খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এটি বিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি।
প্রধান বৈশিষ্ট্য:
- উপকারী বৈশিষ্ট্যগুলি উত্তরাধিকার সূত্রে বংশপরম্পরায় চলতে থাকে।
- অপ্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়।
- ক্রমাগত পরিবর্তনের ফলে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়।
৭. নতুন প্রজাতির উৎপত্তি (Origin of New Species / Speciation)
বহু বছর ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে, যাকে প্রজাতি গঠন বা Speciation বলা হয়।
প্রজাতি গঠনের ধাপ:
- প্রকরণ তৈরি হয়।
- ভৌগোলিক বা প্রজননজনিত বিচ্ছিন্নতা ঘটে।
- ভিন্ন পরিবেশে নতুন বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব হয়।
- পরিবর্তনের ফলে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ:
- ডারউইনের ফিঞ্চ পাখি: গালাপাগোস দ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা খাদ্যাভ্যাসের কারণে পাখির ঠোঁটের গঠন পরিবর্তিত হয়, যা নতুন প্রজাতির সৃষ্টি করে।
ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে কিভাবে জীবজগত পরিবর্তিত হয় এবং নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। এটি জীববিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, যা আধুনিক জেনেটিক্স ও বিবর্তন গবেষণার ভিত্তি।