ভূমিকা
জীববৈচিত্র্য বলতে পৃথিবীর বিভিন্ন জীবের প্রজাতি, তাদের জিনগত বৈচিত্র্য এবং বাস্তুতন্ত্রকে বোঝায়। এটি প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অরণ্যনাশ, নগরায়ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। তাই সংরক্ষণের জন্য বিশেষ অঞ্চলগুলিকে জীববৈচিত্র্য হটস্পট (Biodiversity Hotspot) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
জীববৈচিত্র্য হটস্পট কী?
ব্রিটিশ পরিবেশবিদ নরম্যান মায়ার্স ১৯৮৮ সালে জীববৈচিত্র্য হটস্পট ধারণাটি প্রবর্তন করেন। কোনো অঞ্চলকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে দুইটি শর্ত পূরণ করতে হয়—
- সেখানে কমপক্ষে ১,৫০০ প্রজাতির স্থানীয় (Endemic) উদ্ভিদ থাকতে হবে।
- ঐ অঞ্চলের ৭০% বা তার বেশি প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংস হয়েছে হতে হবে।
ভারতে মোট চারটি প্রধান জীববৈচিত্র্য হটস্পট রয়েছে, যা বিশ্বের ৩৬টি জীববৈচিত্র্য হটস্পটের মধ্যে পড়ে। এই অঞ্চলগুলি হলো—
- পূর্ব হিমালয় হটস্পট
- ইন্দো-বর্মা হটস্পট
- পশ্চিমঘাট ও শ্রীলঙ্কা হটস্পট
- সুন্দাল্যান্ড হটস্পট
এখন এগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাক।
১. পূর্ব হিমালয় হটস্পট
পূর্ব হিমালয় জীববৈচিত্র্য হটস্পটটি ভারতের সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, আসামের উত্তরাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চল এবং ভুটান, নেপাল ও মায়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত।
মূল বৈশিষ্ট্য:
- বিরল প্রাণী ও উদ্ভিদ: এখানে দেখা যায় লাল পান্ডা (Ailurus fulgens), হিমালয়ী তুষারচিতাবাঘ (Panthera uncia) এবং হিমালয়ী মনাল (Lophophorus impejanus)।
- স্থানীয় উদ্ভিদ: নীল পপি (Meconopsis spp.) এবং বিভিন্ন প্রজাতির রডোডেনড্রন।
- বিপদ: বন ধ্বংস, অবৈধ শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন।
- সংরক্ষণ প্রচেষ্টা: সিংগালিলা জাতীয় উদ্যান, নামদাফা জাতীয় উদ্যান।
২. ইন্দো-বর্মা হটস্পট
এই হটস্পটটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (পূর্ব হিমালয় বাদে), মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ চীনে বিস্তৃত।
মূল বৈশিষ্ট্য:
- বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র: উষ্ণমন্ডলীয় বৃষ্টি বন, ম্যানগ্রোভ বন, তৃণভূমি।
- বিরল প্রাণী: এক শৃঙ্গ গণ্ডার (Rhinoceros unicornis), আসাম রুফড কচ্ছপ (Pangshura sylhetensis), হোয়াইট উইংড হাঁস (Asarcornis scutulata)।
- স্থানীয় উদ্ভিদ: বন্য ধানের বিভিন্ন প্রজাতি, ভারতীয় হাতি যাম (Amorphophallus paeoniifolius)।
- বিপদ: কৃষিকাজ, বন উজাড়, অবৈধ কাঠ কাটার কারণে বাসস্থান ধ্বংস।
- সংরক্ষণ প্রচেষ্টা: কাজিরাঙা ও মানস জাতীয় উদ্যান (অসম)।
৩. পশ্চিমঘাট ও শ্রীলঙ্কা হটস্পট
পশ্চিমঘাট পাহাড়শ্রেণী (Sahyadri Hills) ভারতের পশ্চিম উপকূল বরাবর মহারাষ্ট্র, গোয়া, কর্ণাটক, কেরালা, এবং তামিলনাড়ু রাজ্যে বিস্তৃত। এটি শ্রীলঙ্কার সাথেও সংযুক্ত।
মূল বৈশিষ্ট্য:
- উচ্চ স্থানীয়তা (Endemism): এই অঞ্চলের ৫০% উভচর এবং ৩০% উদ্ভিদ প্রজাতি শুধুমাত্র এখানেই পাওয়া যায়।
- গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী: সিংহল লেজওয়ালা বানর (Macaca silenus), মালাবার বন্য বিড়াল (Viverra civettina), নীলগিরি তাহর (Nilgiritragus hylocrius)।
- বিপদ: কৃষি সম্প্রসারণ, চা ও কফির চাষ, আবহাওয়ার পরিবর্তন।
- সংরক্ষণ প্রচেষ্টা: সাইলেন্ট ভ্যালি জাতীয় উদ্যান, পেরিয়ার টাইগার রিজার্ভ, আনামুড়ি শোলা জাতীয় উদ্যান।
৪. সুন্দাল্যান্ড হটস্পট
সুন্দাল্যান্ড হটস্পট ভারত মহাসাগরের কিছু অংশ জুড়ে অবস্থিত, যেখানে নিকারবার দ্বীপপুঞ্জ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ব্রুনাই অন্তর্ভুক্ত।
মূল বৈশিষ্ট্য:
- বিস্তৃত সামুদ্রিক ও স্থলজ বাস্তুতন্ত্র: এখানে রয়েছে নিকোবার মেগাপোড (Megapodius nicobariensis), ডুগং বা সামুদ্রিক গরু (Dugong dugon)।
- ম্যানগ্রোভ বন: যেখানে নোনা জলের কুমির ও বিভিন্ন সামুদ্রিক কাছিমের বাসস্থান রয়েছে।
- বিপদ: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন উজাড়, অবৈধ শিকার।
- সংরক্ষণ প্রচেষ্টা: গ্রেট নিকোবার বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ।
উপসংহার: সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
জীববৈচিত্র্য হটস্পটগুলো শুধুমাত্র পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখে না, বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলে। ভারত সরকার বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান, জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকা এবং বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, জনসচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।