জিনগত রোগ হলো এমন বংশগত ব্যাধি, যা জিনের পরিবর্তনের (mutation) কারণে ঘটে। এই রোগগুলি এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত হতে পারে এবং অনেক সময় মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়। এর মধ্যে থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া এবং রঙ অন্ধত্ব (কালার ব্লাইন্ডনেস) অন্যতম। এই রোগগুলির কারণ, লক্ষণ ও প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা থাকা প্রয়োজন, যাতে এগুলোর সঠিকভাবে নির্ণয় ও চিকিৎসা করা যায়।
১. থ্যালাসেমিয়া: এক ধরনের রক্তের রোগ
থ্যালাসেমিয়া হলো একটি বংশগত রক্তজনিত রোগ, যা হিমোগ্লোবিন উৎপাদনকারী জিনের মিউটেশনের কারণে ঘটে। হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকায় উপস্থিত একটি প্রোটিন, যা শরীরে অক্সিজেন পরিবহন করে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম থাকে, যার ফলে রক্তাল্পতা (anemia) সহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।
থ্যালাসেমিয়ার ধরণ
১. আলফা থ্যালাসেমিয়া (Alpha Thalassemia)
- ক্রোমোজোম ১৬-তে অবস্থিত চারটি আলফা-গ্লোবিন জিনের এক বা একাধিক জিনের মিউটেশনের কারণে ঘটে।
- আক্রান্ত জিনের সংখ্যা অনুযায়ী রোগের তীব্রতা পরিবর্তিত হয়।
- মারাত্মক ক্ষেত্রে হাইড্রপস ফেটালিস (Hydrops Fetalis) হতে পারে, যা শিশুর জন্মের আগেই মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
২. বিটা থ্যালাসেমিয়া (Beta Thalassemia)
- ক্রোমোজোম ১১-তে অবস্থিত বিটা-গ্লোবিন জিনের মিউটেশনের ফলে ঘটে।
- দুই ধরনের হয়:
- থ্যালাসেমিয়া মাইনর (Thalassemia Minor): একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন থাকে, যার ফলে হালকা রক্তাল্পতা হয়।
- থ্যালাসেমিয়া মেজর (Thalassemia Major বা কুলির অ্যানিমিয়া): দুইটি বিটা-গ্লোবিন জিনই ত্রুটিপূর্ণ হয়, যার ফলে মারাত্মক রক্তাল্পতা দেখা দেয় এবং রোগীকে নিয়মিত রক্ত পরিবর্তন করতে হয়।
থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ
- দুর্বলতা ও ক্লান্তি
- ত্বক ফ্যাকাশে বা হলদেটে হওয়া (জন্ডিস)
- শারীরিক বৃদ্ধি বিলম্বিত হওয়া
- মুখমণ্ডলের হাড়ের গঠন বিকৃত হওয়া
- প্লীহা ও যকৃতের আকার বৃদ্ধি পাওয়া
থ্যালাসেমিয়ার কারণ ও উত্তরাধিকার
থ্যালাসেমিয়া হলো অটোজোমাল রিসেসিভ (Autosomal Recessive) বংশগত রোগ, অর্থাৎ এটি তখনই হয় যখন মাতা-পিতা উভয়ের কাছ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তান পায়। যারা কেবলমাত্র এক কপি ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করে, তারা থ্যালাসেমিয়া মাইনর অবস্থায় থাকে এবং সাধারণত বড় কোনো শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হয় না।
২. হিমোফিলিয়া: রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা
হিমোফিলিয়া হলো একটি জিনগত রক্তক্ষরণজনিত রোগ, যা রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন (clotting factors) কম থাকার কারণে ঘটে। এই রোগটি X-ক্রোমোজোমে অবস্থিত জিনের মিউটেশনের ফলে হয়, তাই এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষদের মধ্যে দেখা যায়, আর মহিলারা সাধারণত বাহক (carrier) হিসেবে কাজ করে।
হিমোফিলিয়ার প্রকারভেদ
১. হিমোফিলিয়া A (Classic Hemophilia)
- Factor VIII-এর অভাবে হয়।
- এটি হিমোফিলিয়ার সবচেয়ে সাধারণ ধরণ।
২. হিমোফিলিয়া B (Christmas Disease)
- Factor IX-এর অভাবে হয়।
- লক্ষণসমূহ হিমোফিলিয়া A-এর মতো হলেও ভিন্ন জিনের কারণে হয়।
৩. হিমোফিলিয়া C
- এটি বিরল এবং Factor XI-এর অভাবে ঘটে।
- নারী ও পুরুষ উভয়েই আক্রান্ত হতে পারে।
হিমোফিলিয়ার লক্ষণ
- অল্প ক্ষত থেকেও দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষরণ
- ঘন ঘন নাক থেকে রক্ত পড়া
- শরীরে বড় ও গভীর ক্ষত বা ফোলা (Bruising)
- জয়েন্টের মধ্যে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, যা ব্যথা ও ফোলাভাব সৃষ্টি করে
- মল বা প্রস্রাবে রক্ত দেখা যাওয়া
হিমোফিলিয়ার কারণ ও উত্তরাধিকার
এটি X-লিঙ্কড রিসেসিভ (X-Linked Recessive) রোগ, অর্থাৎ পুরুষরা একক X ক্রোমোজোম থাকার কারণে সরাসরি আক্রান্ত হয়, আর মহিলারা সাধারণত বাহক থাকে। তবে নারীদের ক্ষেত্রেও কিছু ক্ষেত্রে হালকা মাত্রার উপসর্গ দেখা যেতে পারে।
৩. বর্ণান্ধতা (Colour Blindness): এক ধরনের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা
বর্ণান্ধতা হলো একটি জিনগত রোগ, যেখানে ব্যক্তির রঙ চেনার ক্ষমতা ব্যাহত হয়। এটি সাধারণত রেটিনার শঙ্কুকোষের (Cone Cells) গঠনগত ত্রুটির কারণে ঘটে। পুরুষদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, কারণ এটি X-লিঙ্কড রিসেসিভ (X-Linked Recessive) রোগ।
রঙ অন্ধত্বের কারণ
- X-ক্রোমোজোমে অবস্থিত জিনের ত্রুটির কারণে ঘটে।
- পরিবেশগত কারণ বা চোখের আঘাত থেকেও হতে পারে, তবে এটি বিরল।
বর্ণান্ধতার ধরণ
১. লাল-সবুজ রঙ অন্ধত্ব (Red-Green Colour Blindness)
- সবচেয়ে সাধারণ ধরণ।
- আক্রান্ত ব্যক্তি লাল ও সবুজ রঙ ঠিকমতো চিনতে পারে না।
২. নীল-হলুদ বর্ণান্ধতা (Blue-Yellow Colour Blindness)
- কম সাধারণ।
- আক্রান্ত ব্যক্তি নীল ও হলুদ রঙ আলাদা করতে পারে না।
৩. সম্পূর্ণ বর্ণান্ধতা (Achromatopsia)
- অত্যন্ত বিরল।
- আক্রান্ত ব্যক্তি কেবল ধূসর শেডে দেখতে পায়।
বর্ণান্ধতার লক্ষণ
- নির্দিষ্ট কিছু রঙ চিনতে সমস্যা
- রঙের বিভিন্ন শেড বা ছায়া পার্থক্য করতে না পারা
- সম্পূর্ণ রঙহীন দৃষ্টি (গুরুতর ক্ষেত্রে)