সিন্ধুতীরে- সৈয়দ আলাওল

কন্যারে ফেলিল যথা জলের মাঝারে তথা 

দিব্য পুরী সমুদ্র মাঝার।

অতি মনোহর দেশ নাহি তথা দুঃখ ক্লেশ 

সত্য ধর্ম সদা সদাচার ।।

সমুদ্রনৃপতি সুতা পদ্মা নামে গুণযুতা 

সিন্ধুতীরে দেখি দিব্যস্থান।

উপরে পর্বত এক ফল ফুলে অতিরেক 

তার পাশে রচিল উদ্যান।।

নানা পুষ্প মনোহর সুগন্ধি সৌরভতর 

নানা ফল বৃক্ষ সুলক্ষণ।

তাহাতে বিচিত্র টঙ্গি হেমরত্বে নানা রঙ্গি 

তথা কন্যা থাকে সর্বক্ষণ।।

পিতৃপুরে ছিল নিশি নানাসুখে খেলি হাসি 

যদি হৈল সময় প্রত্যুষ।

সখীগণ করি সঙ্গে আসিতে উদ্যানে রঙ্গে 

সিন্ধুতীরে রহিছে মাঞ্জুস।

মনেতে কৌতুক বাসি তুরিত গমনে আসি 

দেখে চারি সখী চারিভিত।

মধ্যেতে যে কন্যাখানি রূপে অতি রম্ভা জিনি 

নিপতিতা চেতন রহিত।

দেখিয়া রূপের কলা বিস্মিত হইল বালা 

অনুমান করে নিজ চিতে।

ইন্দ্রশাপে বিদ্যাধরি কিবা স্বর্গভ্রষ্ট করি 

অচৈতন্য পড়িছে ভূমিতে।।

বেকত দেখিয়ে আঁখি তেন স-বসন সাক্ষী 

বেথানিত হৈছে কেশ বেশ।

বুঝি সমুদ্রের নাও ভাঙ্গিল প্রবল বাও 

মোহিত পাইয়া সিন্ধু-ক্লেশ।।

চিত্রের পোতলি সমা নিপতিত মনোরমা 

কিঞ্চিৎ আছয় মাত্র শ্বাস।

অতি স্নেহ ভাবি মনে বলে পদ্মা ততক্ষণে 

বিধি মোরে না কর নৈরাশ।

পিতার পুণ্যের ফলে মোহর ভাগ্যের বলে 

বাহুরক কন্যার জীবন।

চিকিৎসিমু প্রাণপণ কৃপা কর নিরঞ্জন 

দুখিনীরে করিয়া স্মরণ।

সখী সবে আজ্ঞা দিল উদ্যানের মাঝে নিল

পঞ্চজনে বসনে ঢাকিয়া।

অগ্নি জ্বালি ছেকে গাও কেহ শিরে কেহ পাও

 তন্ত্রে মন্ত্রে মহৌষধি দিয়া।

দণ্ড চারি এই মতে বহু যত্নে চিকিৎসিতে 

পঞ্চকন্যা পাইলা চেতন।

শ্রীযুত মাগন গুণী মোহন্ত আরতি শুনি 

হীন আলাওল সুরচন।।

_________________________________________________________________________

সারাংশ:

কবিতাটিতে এক বিচ্ছিন্ন প্রেমিক তার প্রেমিকার কাছে পৌঁছাতে চায়। কিন্তু প্রেমিকা রয়েছে সিন্ধুতীরে — অর্থাৎ, সেই প্রেমিকা দূরবর্তী, দুর্গম, এবং তার কাছে পৌঁছানো সহজ নয়।
সিন্ধু এখানে কেবল সমুদ্র নয়, এক অতিক্রমনীয় মানসিক-আধ্যাত্মিক দূরত্বের প্রতীক। প্রেমিক তার সমস্ত বাধা ও কষ্ট সহ্য করে প্রেমিকার প্রতি আকুল হয়ে আছে।

এই প্রেমিকের আকাঙ্ক্ষা কেবল শারীরিক বা জাগতিক প্রেম নয় — বরং আধ্যাত্মিক প্রেমের প্রতীক হিসেবেও পাঠ করা যায়।
প্রেমিকা এখানে ঈশ্বর, সাধনার গন্তব্য বা চিরলাভের বস্তু, যার জন্য প্রেমিক বারে বারে চেষ্টা করে পৌঁছাতে।

বিষয়বস্তু:

  • প্রেম ও বিচ্ছেদ
  • আকাঙ্ক্ষা ও আরাধনা
  • সাধনা ও প্রেমের গভীরতা
  • নিঃসঙ্গতা ও প্রত্যাশা

উপসংহার:

সিন্ধুতীরে” শুধু একটি প্রেমের কবিতা নয় — এটি আধ্যাত্মিক মিলনের আকাঙ্ক্ষায় এক অনবদ্য কবিতার ধারা, যেখানে প্রাচীন বাংলার সৌন্দর্য, ভাবগাম্ভীর্য ও মানবিক অনুভূতি একত্রে মিশে আছে।

Scroll to Top