মেন্ডেলের পরীক্ষা ও মেন্ডেলের সূত্র: মটর গাছের ডাইহাইব্রিড সংকরায়ন

ভূমিকা

বংশগতির (Heredity) মাধ্যমে অভিভাবকের বৈশিষ্ট্যগুলি তাদের সন্তানদের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। গ্রেগর মেন্ডেল, যিনি “আধুনিক জিনতত্ত্বের জনক” নামে পরিচিত, মটর গাছ (Pisum sativum) নিয়ে গবেষণা করে দেখান, কিভাবে বৈশিষ্ট্যগুলি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়। তাঁর গবেষণার ভিত্তিতেই মেন্ডেলের বংশগতির সূত্রসমূহ প্রণীত হয়।

মেন্ডেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ছিল দ্বিবৈশিষ্টিক সংকরায়ন (Dihybrid Cross), যা একসঙ্গে দুটি বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকারের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করে। এই পরীক্ষার ফলাফল থেকে তিনি স্বাধীন পৃথকীকরণ সূত্র (Law of Independent Assortment) আবিষ্কার করেন।

মেন্ডেলের পরীক্ষা: মটর গাছের দ্বিবৈশিষ্টিক সংকরায়ন

১. বৈশিষ্ট্য নির্বাচন

মেন্ডেল দুটি বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য নির্বাচন করেন—

  • বীজের আকৃতি: গোলাকার (Dominant) বনাম কুঁচকানো (Recessive)
  • বীজের রং: হলুদ (Dominant) বনাম সবুজ (Recessive)

২. পিতামাতার (P) প্রজন্ম

তিনি এমন দুটি মটর গাছকে সংকরায়ন করেন, যারা উভয় বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশুদ্ধ ছিল:

  • এক গাছে ছিল গোলাকার, হলুদ বীজ (RRYY)
  • অন্য গাছে ছিল কুঁচকানো, সবুজ বীজ (rryy)

৩. প্রথম প্রজন্ম (F₁ Generation)

প্রথম প্রজন্মের সমস্ত বংশধর গোলাকার, হলুদ বীজ (RrYy) যুক্ত হয়। অর্থাৎ, প্রভাবশালী বৈশিষ্ট্য (গোলাকার ও হলুদ) দমনশীল বৈশিষ্ট্যকে (কুঁচকানো ও সবুজ) ঢেকে দেয়।

৪. F₁ প্রজন্মের স্ব-পরাগায়ন (Self-Pollination)

এরপর মেন্ডেল F₁ প্রজন্মের উদ্ভিদগুলিকে স্ব-পরাগায়নের (Self-Pollination) সুযোগ দেন। এর ফলে F₂ প্রজন্ম তৈরি হয়, যেখানে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে নতুন উদ্ভিদ গঠিত হয়।

দ্বিবৈশিষ্টিক সংকরায়নের পানেট স্কোয়ার (Punnett Square)

নিচের ছকটি RrYy × RrYy সংকরায়নের ফলে প্রাপ্ত F₂ প্রজন্মের সম্ভাব্য ফলাফল দেখায়—

গ্যামেট RY Ry rY ry
RY RRY Y RRY y RrY Y RrY y
Ry RRY y RR yy RrY y Rr yy
rY RrY Y RrY y rrY Y rrY y
ry RrY y Rr yy rrY y rr yy

এখানে দেখা যায়—

  • ৯টি গাছে গোলাকার, হলুদ বীজ (R_Y_)
  • ৩টি গাছে গোলাকার, সবুজ বীজ (R_yy)
  • ৩টি গাছে কুঁচকানো, হলুদ বীজ (rrY_)
  • ১টি গাছে কুঁচকানো, সবুজ বীজ (rryy)

অর্থাৎ, F₂ প্রজন্মের ফেনোটাইপ অনুপাত হল 9:3:3:1

মেন্ডেলের সূত্র (Mendel’s Laws) ও দ্বিবৈশিষ্টিক সংকরায়ন

১. আধিপত্যের সূত্র (Law of Dominance)

  • বৈশিষ্ট্য নির্ধারণকারী উপাদান (Gene) যুগ্মভাবে (Allele) উপস্থিত থাকে।
  • প্রভাবশালী (Dominant) জিন উপস্থিত থাকলে সেটির বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়, এবং দমনশীল (Recessive) জিন গোপন থাকে।

২. পৃথকীকরণের সূত্র (Law of Segregation)

  • প্রতিটি জোড়া এলিল (Allele) গ্যামেট গঠনের সময় পৃথক হয়, ফলে প্রতিটি গ্যামেট শুধুমাত্র একটি এলিল বহন করে
  • এ কারণেই F₂ প্রজন্মে দমনশীল বৈশিষ্ট্য পুনরায় প্রকাশিত হয়

৩. স্বাধীন পৃথকীকরণের সূত্র (Law of Independent Assortment)

  • একটি বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার আরেকটি বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে না
  • প্রতিটি জিন স্বাধীনভাবে পৃথক হয়, যার ফলে বিভিন্ন প্রকার সংকর গঠন সম্ভব হয়।

 

মেন্ডেলের দ্বিবৈশিষ্টিক সংকরায়ন পরীক্ষা দেখিয়েছে যে বংশগতির নির্দিষ্ট নিয়ম ও অনুপাত রয়েছে। F₂ প্রজন্মে 9:3:3:1 অনুপাত প্রমাণ করে যে আলাদা বৈশিষ্ট্যগুলি একে অপরের থেকে স্বাধীনভাবে উত্তরাধিকৃত হয়

মেন্ডেলের সূত্রসমূহ আজকের আধুনিক জিনতত্ত্ব, উদ্ভিদ প্রজনন ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

Scroll to Top