মাইটোসিসের ধাপসমূহ: কোষ বিভাজন এবং কোষ চক্রের ধারণা

ভূমিকা

কোষ বিভাজন (Cell Division) জীবজগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈব প্রক্রিয়া, যা বৃদ্ধি, পুনরুৎপাদন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কোষ প্রতিস্থাপনের জন্য অপরিহার্য। বহুকোষী প্রাণীদের দেহে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে নতুন কোষ সৃষ্টি হয়, যা দেহের বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে সহায়তা করে।

কোষ বিভাজন প্রধানত দুই ধরনের হয়— মাইটোসিস (Mitosis) এবং মিয়োসিস (Meiosis)। মিয়োসিস শুধুমাত্র জনন কোষ (যেমন শুক্রাণু ও ডিম্বাণু) উৎপাদনে ঘটে, যেখানে মাইটোসিস দেহকোষে সংঘটিত হয় এবং দুটি অভিন্ন (genetically identical) কন্যা কোষ তৈরি করে।

মাইটোসিস হল একটি সুসংগঠিত প্রক্রিয়া, যা কোষ চক্রের (Cell Cycle) অন্তর্গত। এটি কোষের জিনগত উপাদান সঠিকভাবে বিতরণ করে এবং স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। মাইটোসিস চারটি প্রধান ধাপে বিভক্ত— প্রোফেজ (Prophase), মেটাফেজ (Metaphase), অ্যানাফেজ (Anaphase) এবং টেলোফেজ (Telophase)। প্রতিটি ধাপ কোষের নির্দিষ্ট পরিবর্তন নির্দেশ করে।

কোষ চক্র এবং মাইটোসিস

কোনো কোষ জন্ম নেওয়ার পর থেকে বিভাজন হওয়া পর্যন্ত যে সমস্ত ধাপ অতিক্রম করে, তাকে কোষ চক্র (Cell Cycle) বলে। এটি দুইটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত—

  1. ইন্টারফেজ (Interphase) – কোষের বৃদ্ধি, ডিএনএ অনুলিপি (DNA replication) এবং বিভাজনের জন্য প্রস্তুতির সময়কাল।
  2. মাইটোসিস (M Phase) – প্রকৃত বিভাজন, যেখানে নিউক্লিয়াস এবং সাইটোপ্লাজম বিভক্ত হয়।

ইন্টারফেজ চলাকালীন কোষ তার ডিএনএ দ্বিগুণ করে, যাতে বিভাজনের পরে প্রতিটি কন্যা কোষ একই পরিমাণ জিনগত উপাদান পায়। ইন্টারফেজ সম্পন্ন হলে কোষ মাইটোসিসে প্রবেশ করে

মাইটোসিসের ধাপসমূহ

১. প্রোফেজ (Prophase): ক্রোমোজোম সংকোচন প্রক্রিয়া শুরু

প্রোফেজ মাইটোসিসের প্রথম ও দীর্ঘতম ধাপ, যেখানে কোষের অভ্যন্তরে নিম্নলিখিত পরিবর্তন ঘটে—

  • ক্রোমাটিন (Chromatin) সংকুচিত হয়ে সুস্পষ্ট ক্রোমোজোম (Chromosome) গঠন করে।
  • প্রতিটি ক্রোমোজোমে দুইটি অভিন্ন সিস্টার ক্রোমাটিড (Sister Chromatid) থাকে, যা সেন্ট্রোমিয়ার (Centromere) দ্বারা সংযুক্ত থাকে।
  • নিউক্লিয়ার মেমব্রেন (Nuclear Membrane) ভেঙে যেতে শুরু করে, যার ফলে ক্রোমোজোম কোষের সাইটোপ্লাজমে প্রবেশ করতে পারে।
  • নিউক্লিওলাস (Nucleolus) অদৃশ্য হয়ে যায়।
  • প্রাণী কোষে সেন্ট্রিওল (Centriole) দুটো বিপরীত মেরুর দিকে সরে যায় এবং মাইটোটিক স্পিন্ডল (Mitotic Spindle) তৈরি করে।
  • স্পিন্ডল ফাইবার (Spindle Fiber) ক্রোমোজোমের সাথে সংযুক্ত হতে শুরু করে।

গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য: ক্রোমোজোম সংকোচন, স্পিন্ডল ফাইবার গঠন, নিউক্লিয়ার মেমব্রেন অবক্ষয়।

২. মেটাফেজ (Metaphase): ক্রোমোজোম সারিবদ্ধকরণ

মেটাফেজে, ক্রোমোজোমগুলি কোষের কেন্দ্রে এক সরলরেখায় সারিবদ্ধ হয়, যাকে মেটাফেজ প্লেট (Metaphase Plate) বলা হয়।

  • স্পিন্ডল ফাইবার ক্রোমোজোমের কাইনেটোকোর (Kinetochore) এর সাথে যুক্ত হয়।
  • ক্রোমোজোমগুলি মেটাফেজ প্লেটে সমানভাবে সারিবদ্ধ হয়, যাতে প্রতিটি কন্যা কোষ সমান সংখ্যক ক্রোমোজোম পায়।
  • এই ধাপে মেটাফেজ চেকপয়েন্ট (Metaphase Checkpoint) কাজ করে, যা নিশ্চিত করে যে প্রতিটি ক্রোমোজোম সঠিকভাবে সংযুক্ত আছে এবং বিভাজনের জন্য প্রস্তুত।

গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য: ক্রোমোজোমের মেটাফেজ প্লেটে সারিবদ্ধকরণ, স্পিন্ডল ফাইবার সংযুক্তি, চেকপয়েন্ট কার্যকারিতা।

৩. অ্যানাফেজ (Anaphase): সিস্টার ক্রোমাটিড বিচ্ছেদ

অ্যানাফেজ মাইটোসিসের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যেখানে সিস্টার ক্রোমাটিডগুলি বিপরীত মেরুর দিকে টানা হয়

  • সেন্ট্রোমিয়ার বিভক্ত হয়, যার ফলে প্রতিটি ক্রোমাটিড পৃথক ক্রোমোজোমে রূপান্তরিত হয়।
  • স্পিন্ডল ফাইবার ক্রোমোজোমগুলোকে কোষের বিপরীত মেরুর দিকে নিয়ে যায়।
  • কোষটি লম্বা হতে শুরু করে।

গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য: ক্রোমাটিড বিচ্ছেদ, ক্রোমোজোম মেরুর দিকে গমন, কোষের প্রসারণ।

৪. টেলোফেজ (Telophase): নিউক্লিয়ার পুনর্গঠন

টেলোফেজ মাইটোসিসের শেষ ধাপ, যেখানে কোষ বিভাজনের সমাপ্তি ঘটে—

  • ক্রোমোজোম ডিকন্ডেন্স হয়ে পুনরায় ক্রোমাটিন এ পরিণত হয়।
  • প্রতিটি মেরুতে নতুন নিউক্লিয়ার মেমব্রেন গঠিত হয়।
  • স্পিন্ডল ফাইবার ভেঙে যায়।
  • নিউক্লিওলাস পুনরায় দৃশ্যমান হয়।

গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য: নিউক্লিয়ার মেমব্রেন পুনর্গঠন, ক্রোমোজোম ডিকন্ডেন্স, মাইটোসিস সমাপ্তি।

সাইটোকাইনেসিস: চূড়ান্ত পর্যায়

সাইটোকাইনেসিস (Cytokinesis) মাইটোসিসের পরে সংঘটিত হয় এবং সাইটোপ্লাজম বিভক্ত করে দুটি পৃথক কন্যা কোষ তৈরি করে

  • প্রাণী কোষেক্লিভেজ ফারো (Cleavage Furrow) গঠিত হয় এবং কোষটি বিভক্ত হয়।
  • উদ্ভিদ কোষেসেল প্লেট (Cell Plate) তৈরি হয়, যা নতুন কোষ প্রাচীরের গঠন নিশ্চিত করে।

মাইটোসিসের গুরুত্ব

  1. শারীরিক বৃদ্ধি – কোষ সংখ্যা বৃদ্ধি করে জীবের বৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
  2. টিস্যু মেরামত – ক্ষতিগ্রস্ত কোষ প্রতিস্থাপন করে।
  3. অযৌন প্রজনন – এককোষী জীবের জন্য মাইটোসিস গুরুত্বপূর্ণ।
  4. জিনগত স্থায়িত্ব – কন্যা কোষের জিনগত উপাদান অপরিবর্তিত রাখে।

উপসংহার

মাইটোসিস হল একটি গুরুত্বপূর্ণ কোষ বিভাজন প্রক্রিয়া, যা জীবের বৃদ্ধি, উন্নয়ন এবং টিস্যু মেরামতের জন্য অপরিহার্য। সঠিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়া মাইটোসিস ব্যাহত হলে ক্যান্সার এর মতো রোগ দেখা দিতে পারে।

Scroll to Top