বিকল্প চিন্তা ও উদ্যোগ

বিষয়বস্তু: উনিশ শতকে বাংলায় ছাপাখানার আগমন জ্ঞান বিস্তারের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এই আলোচনায় বাংলায় ছাপাখানার বিকাশ, মুদ্রিত গ্রন্থের মাধ্যমে জ্ঞান বিতরণ এবং এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হবে। এই প্রসঙ্গে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইউ. রায় অ্যান্ড সন্সের অগ্রণী ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাংলায় ছাপাখানার বিস্তার

বাংলায় ছাপাখানার প্রবর্তন, প্রাথমিকভাবে ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রয়োজনে হলেও, উনিশ শতকে এর ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং এটি জ্ঞান বিতরণ ও বাণিজ্যের এক নতুন মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

  • প্রাথমিক পর্যায় ও বিস্তার: আঠারো শতকের শেষদিকে ছাপাখানার প্রাথমিক প্রতিষ্ঠা দেখা যায়, যেখানে জেমস অগাস্টাস হিকি এবং শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশন প্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উনিশ শতকে বাঙালিদের মালিকানাধীন ছাপাখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এই স্থানীয়করণ স্থানীয় চাহিদা ও আগ্রহ পূরণে আরও বিস্তৃত পরিসরের মুদ্রণ সামগ্রী প্রকাশের সুবিধা করে তোলে।
  • মুদ্রণ ও জ্ঞান বিস্তারের যোগসূত্র: ছাপাখানা জ্ঞান অর্জন ও প্রচারের পদ্ধতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। বই, সংবাদপত্র, জার্নাল এবং প্যামফলেট সুলভে ও সহজে লভ্য হওয়ায় তথ্যের ঐতিহ্যবাহী বাধা ভেঙে যায়। এর ফলে:
    • শিক্ষার অগ্রগতি: পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষামূলক সামগ্রীর মুদ্রণ ক্রমবর্ধমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে সহায়তা করে এবং বৃহত্তর ছাত্র জনসংখ্যার কাছে পৌঁছায়।
    • সাহিত্যিক বিকাশ: লেখকরা তাদের কাজের জন্য বৃহত্তর পাঠক গোষ্ঠী পান, যা বিভিন্ন ধারার বাংলা সাহিত্যের বিকাশে সহায়ক হয়।
    • সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন: সংস্কারবাদী সংগঠনগুলি তাদের ধারণা প্রচার, জনসমক্ষে বিতর্ক এবং সামাজিক পরিবর্তনের জন্য সমর্থন আদায়ে মুদ্রিত সামগ্রী ব্যবহার করে।
    • জনমতের উত্থান: সংবাদপত্র ও জার্নাল জনমত গঠনে, রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে এবং জাতীয়তাবাদী sentiments প্রকাশে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
  • মুদ্রণের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা: মুদ্রিত সামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে মুদ্রণ একটি লাভজনক বাণিজ্যিক উদ্যোগে পরিণত হয়। বাঙালি উদ্যোক্তারা ছাপাখানা ও প্রকাশনা সংস্থা স্থাপন করে বই, সাময়িকী এবং অন্যান্য মুদ্রিত সামগ্রীর ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে শুরু করেন। জনপ্রিয় সাহিত্য, পাঠ্যপুস্তক এবং ধর্মীয় গ্রন্থের প্রকাশনা বিশেষভাবে লাভজনক প্রমাণিত হয়।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ও ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স: উন্নত মুদ্রণের পথিকৃৎ

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (১৮৬৩-১৯১৫) ছিলেন বাংলার এক বহুমুখী প্রতিভা, যিনি লেখক, শিল্পী, সুরকার এবং মুদ্রণ শিল্পের একজন অগ্রণী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। তাঁর এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইউ. রায় অ্যান্ড সন্সের অবদান বাংলায় মুদ্রণের মানোন্নয়নে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

  • উপেন্দ্রকিশোরের উদ্ভাবনী উদ্যোগ: 
    • আধুনিক ব্লক তৈরির কৌশল প্রবর্তন: উপেন্দ্রকিশোর দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম হাফটোন ও রঙিন ব্লক মুদ্রণের মতো উন্নত ব্লক তৈরির কৌশল প্রবর্তন করেন। ইংল্যান্ড থেকে সরঞ্জাম ও রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি করে তিনি এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করেন এবং তাঁর প্রকাশনাগুলিতে উন্নত মানের চিত্র পুনরুৎপাদন নিশ্চিত করেন।
    • ‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রবর্তন: ১৯১৩ সালে তিনি বাংলা শিশুসাহিত্যের এক মাইলফলক পত্রিকা ‘সন্দেশ’ প্রকাশ করেন। পত্রিকাটি কেবল আকর্ষণীয় বিষয়বস্তুর জন্যই নয়, এর ব্যতিক্রমী মুদ্রণ গুণমানের জন্যও বিখ্যাত ছিল।
    • মুদ্রণ প্রযুক্তির উন্নয়ন: উপেন্দ্রকিশোর মুদ্রণ প্রযুক্তির উন্নয়নে নিরলসভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যান। তাঁর উদ্ভাবিত ‘স্ক্রিন-অ্যাডজাস্টিং মেশিন’ প্রসেস ক্যামেরার স্বয়ংক্রিয় ফোকাসিং-এ সহায়ক ছিল, যা তাঁর প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রমাণ দেয়।
    • আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: ব্লক তৈরি ও মুদ্রণ সংক্রান্ত তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলি ব্রিটিশের বিখ্যাত ‘পেনরোজ অ্যানুয়াল ভলিউম’-এ প্রকাশিত হয়, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি এনে দেয়।
  • ইউ. রায় অ্যান্ড সন্সের স্থায়ী অবদান: 
    • অত্যাধুনিক ছাপাখানা স্থাপন: ১৯১৪ সালে উপেন্দ্রকিশোর কলকাতায় ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স নামে একটি অত্যাধুনিক ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। এই ছাপাখানা অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নত মুদ্রণ গুণমান এবং ছবি ও রঙের নিখুঁত পুনরুৎপাদনের জন্য খ্যাতি লাভ করে।
    • একটি সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগ: ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কেন্দ্র ছিল না, এটি একটি সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগও ছিল। এটি বই ও সাময়িকী সহ বিভিন্ন ধরনের মুদ্রণ চাহিদা পূরণ করত এবং ‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রধান প্রকাশক ছিল। গুণমানের প্রতি অঙ্গীকার সংস্থাটিকে বাংলা মুদ্রণ শিল্পের শীর্ষে স্থাপন করে।
    • প্রতিভা লালন ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা: উপেন্দ্রকিশোর তাঁর পুত্র সুকুমার রায়কে মুদ্রণ প্রযুক্তির উন্নত জ্ঞান অর্জনের জন্য ইংল্যান্ডে প্রেরণ করেন। সুকুমার রায় পরবর্তীতে ‘সন্দেশ’-এর সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করেন এবং ইউ. রায় অ্যান্ড সন্সের ঐতিহ্যকে आगे নিয়ে যান। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় ছিলেন উপেন্দ্রকিশোরের পৌত্র।

 

Scroll to Top