জীববৈচিত্র্য এবং এর সংরক্ষণ: এক্স-সিটু সংরক্ষণের (Ex Situ Conservation) উদাহরণ ও বৈশিষ্ট্য

ভূমিকা

জীববৈচিত্র্য হল পৃথিবীর বিভিন্ন জীবের বৈচিত্র্যময় সমষ্টি, যা পরিবেশগত ভারসাম্য এবং মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও অতিরিক্ত শিকার জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে, ফলে অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

সংরক্ষণ কৌশল প্রধানত দুই প্রকার—

  1. অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ (In Situ Conservation): প্রাকৃতিক আবাসস্থলে জীব সংরক্ষণ।
  2. বহিঃস্থ সংরক্ষণ (Ex Situ Conservation): প্রকৃতির বাইরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জীব সংরক্ষণ।

এই নিবন্ধে, বহিঃস্থ সংরক্ষণের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিজুলজিক্যাল গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ক্রায়োপ্রিজারভেশন—এর বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব আলোচনা করা হয়েছে।

১. জুলজিক্যাল গার্ডেন (Zoological Garden)

সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য

একটি জুলজিক্যাল গার্ডেন বা চিড়িয়াখানা হল একটি সংরক্ষিত এলাকা, যেখানে বিভিন্ন প্রাণীকে নিরাপদ পরিবেশে পালন ও সংরক্ষণ করা হয়। এটি প্রাণী সংরক্ষণ, গবেষণা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়।

জুলজিক্যাল গার্ডেনের প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • ক্যাপটিভ ব্রিডিং (Captive Breeding): বিপন্ন প্রজাতিগুলোর সংখ্যা বাড়াতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্রজনন করা হয়।
  • প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতিলিপি: আধুনিক চিড়িয়াখানাগুলো প্রাণীদের জন্য তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থলের অনুরূপ পরিবেশ তৈরি করে।
  • জনসচেতনতা ও শিক্ষা: দর্শনার্থীদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতন করা হয়।
  • বৈজ্ঞানিক গবেষণা: প্রাণীর জিনতত্ত্ব, রোগ ও আচরণ সংক্রান্ত গবেষণা করা হয়।
  • প্রজাতি পুনঃপ্রবর্তন (Rehabilitation & Reintroduction): সংরক্ষিত পরিবেশে প্রতিপালিত কিছু প্রাণীকে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

ভারতের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জুলজিক্যাল গার্ডেন:

  • আলিপুর চিড়িয়াখানা (পশ্চিমবঙ্গ)
  • মহীশূর চিড়িয়াখানা (কর্ণাটক)
  • দিল্লি চিড়িয়াখানা (দিল্লি)

২. বোটানিক্যাল গার্ডেন (Botanical Garden)

সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য

একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন হল এমন একটি সংরক্ষিত উদ্যান যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা জন্মানো, সংরক্ষণ ও গবেষণা করা হয়।

বোটানিক্যাল গার্ডেনের প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • উদ্ভিদের সংরক্ষণ: বিপন্ন, ঔষধি ও দুর্লভ উদ্ভিদের সংরক্ষণ করা হয়।
  • সিড ব্যাংক (Seed Bank) ও জিন সংরক্ষণ কেন্দ্র: উদ্ভিদের বীজ ও জিন নমুনা সংরক্ষণ করা হয়।
  • গবেষণা ও শিক্ষা: উদ্ভিদবিজ্ঞান, ট্যাক্সোনমি এবং পরিবেশ গবেষণার জন্য ব্যবহৃত হয়।
  • পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি: দর্শনার্থীদের মধ্যে গাছপালা সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়।
  • বৈচিত্র্যময় জলবায়ুতে অভিযোজন গবেষণা: বিভিন্ন জলবায়ুর গাছপালা সংরক্ষণ করে তাদের অভিযোজন ক্ষমতা পর্যালোচনা করা হয়।

ভারতের উল্লেখযোগ্য বোটানিক্যাল গার্ডেন:

  • আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ভারতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, পশ্চিমবঙ্গ
  • লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন, কর্ণাটক
  • ট্রপিক্যাল বোটানিক গার্ডেন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, কেরালা

৩. ক্রায়োপ্রিজারভেশন (Cryopreservation)

সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য

ক্রায়োপ্রিজারভেশন হল এমন একটি উন্নত বায়োটেকনোলজিক্যাল পদ্ধতি, যেখানে জৈব উপাদান (বীজ, ভ্রূণ, শুক্রাণু, ডিম্বাণু) -১৯৬°C তাপমাত্রায় তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করা হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়।

ক্রায়োপ্রিজারভেশনের প্রধান বৈশিষ্ট্য:

  • দীর্ঘমেয়াদী সংরক্ষণ: কয়েক দশক ধরে জিন নমুনা সংরক্ষণ করা যায়।
  • জিনগত বৈচিত্র্য সংরক্ষণ: বিপন্ন প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষা করা হয়।
  • কৃষি ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহার: উদ্ভিদ ও প্রাণী সংরক্ষণ ছাড়াও এটি চিকিৎসা গবেষণায় ব্যবহৃত হয়।
  • উচ্চ সাফল্যের হার: সংরক্ষিত নমুনাগুলো পরবর্তী সময়ে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।
  • ক্লোনিং ও প্রজনন সহায়তা: বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সংরক্ষণে এটি অত্যন্ত কার্যকর।

ভারতের উল্লেখযোগ্য ক্রায়োপ্রিজারভেশন কেন্দ্র:

  • ন্যাশনাল ব্যুরো অফ অ্যানিমাল জেনেটিক রিসোর্সেস (NBAGR), হরিয়ানা
  • ন্যাশনাল ব্যুরো অফ প্ল্যান্ট জেনেটিক রিসোর্সেস (NBPGR), দিল্লি

 

বহিঃস্থ সংরক্ষণ পদ্ধতি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জুলজিক্যাল গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং ক্রায়োপ্রিজারভেশন প্রাণী ও উদ্ভিদ সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রজাতির বিলুপ্তি প্রতিরোধ করে। পাশাপাশি, প্রজনন, গবেষণা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণের পাশাপাশি বহিঃস্থ সংরক্ষণ কৌশলগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মূল চাবিকাঠি।

Scroll to Top