আফ্রিকা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উদ্ভ্রান্ত সেই আদিম যুগে 

স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি অসন্তোষে

নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিলেন বিধ্বস্ত, 

তাঁর সেই অধৈর্যে ঘন-ঘন মাথা নাড়ার দিনে 

রুদ্র সমুদ্রের বাহু 

প্রাচী ধরিত্রীর বুকের থেকে 

ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা-

বাঁধলে তোমাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায় 

কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে।

সেখানে নিভৃত অবকাশে তুমি 

সংগ্রহ করছিলে দুর্গমের রহস্য, 

চিনছিলে জলস্থল-আকাশের দুর্বোধ সংকেত, 

প্রকৃতির দৃষ্টি-অতীত জাদু 

মন্ত্র জাগাচ্ছিল, তোমার চেতনাতীত মনে। 

বিদ্রূপ করছিলে ভীষণকে বিরূপের ছদ্মবেশে, 

শঙ্কাকে চাচ্ছিলে হার মানাতে 

আপনাকে উগ্র ক’রে বিভীষিকার প্রচণ্ড মহিমায় 

তাণ্ডবের দুন্দুভিনিনাদে।

 

হায় ছায়াবৃতা, 

কালো ঘোমটার নীচে অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ 

উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে। 

এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে, 

নখ যাদের তীক্ষ্ম তোমার নেকড়ের চেয়ে, 

এল মানুষ-ধরার দল 

গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।

সভ্যের বর্বর লোভ

নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।

তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাষ্পাকুল অরণ্যপথে

পঙ্কিল হলো ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে, 

দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়

বীভৎস কাদার পিন্ড 

চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে।।

 

সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই তাদের পাড়ায় পাড়ায় 

মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘণ্টা 

সকালে সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে; 

শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে;

কবির সংগীতে বেজে উঠেছিল 

সুন্দরের আরাধনা ।।

 

আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে 

প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রুদ্ধশ্বাস, 

যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এল-

অশুভ ধ্বনিতে ঘোষণা করল দিনের অন্তিমকাল, 

এসো যুগান্তের কবি, 

আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে 

দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে; 

বলো ‘ক্ষমা করো’-

হিংস্র প্রলাপের মধ্যে 

সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী ।।

 

_________________________________________________________________________

সারাংশঃ

রবীন্দ্রনাথ ‘আফ্রিকা’ কবিতায় দেখিয়েছেন, কিভাবে একসময় শক্তিশালী ও গর্বিত আফ্রিকা সভ্যতার আলো নিয়ে জেগে উঠেছিল। কিন্তু এরপর বিদেশি দাসব্যবসায়ী ও ঔপনিবেশিক শাসকরা তাকে শৃঙ্খলিত ও অবমানিত করেছে। আফ্রিকার ধনী ভূখণ্ড, তার স্বর্ণ-হীরার লোভে পাশ্চাত্য জাতিরা তাকে দাস বানিয়ে নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছে।

কবি আফ্রিকাকে কল্পনা করেছেন এক কালো নারীর রূপে — যাকে কাঁটাঝোপের মতো রুক্ষ করে তোলা হয়েছে, যার গাত্রে হিংস্র হাতের দাগ পড়েছে। কিন্তু কবি এখানেই থেমে যান না। তিনি আশাবাদী — আফ্রিকা আবার জাগবে, সে আবার দাঁড়াবে মাথা উঁচু করে।

মূল ভাবনা:

  • আফ্রিকা একসময় সমৃদ্ধ ছিল।
  • পাশ্চাত্য জাতিরা তাকে দাসত্বে পরিণত করেছে।
  • শোষণ, লাঞ্ছনার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে তার।
  • কবি আশা করেন, আফ্রিকা আবার মুক্ত হবে, আত্মমর্যাদায় জেগে উঠবে।

✨ বার্তা:

“আফ্রিকা শুধুই নিপীড়িত এক ভূখণ্ড নয়, সে এক জীবন্ত আত্মা — যাকে জাগতে হবে, জেগে উঠতেই হবে।”

এই কবিতা শুধু আফ্রিকার নয়, বিশ্বব্যাপী শোষিত জাতিগুলোরও প্রতিচ্ছবি।

Scroll to Top