বর্ণনা:
ভেদ (Variation) অধ্যায়টি দশম শ্রেণির পশ্চিমবঙ্গ মাধ্যমিক বোর্ডের গণিত পাঠক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অধ্যায়ে শিক্ষার্থীরা সরাসরি ভেদ (Direct Variation), বিপরীত ভেদ (Inverse Variation) এবং যৌগিক ভেদ (Joint Variation) সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। এখানে সংখ্যার মধ্যে সম্পর্ক, সমানুপাতিকতা, এবং বাস্তব উদাহরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা ভেদের বিভিন্ন ধরন সহজে বুঝতে পারে ও প্রয়োগ করতে পারে।
১. ভেদের ধারণা (Concept of Variation)
ভেদ বোঝায় দুটি বা ততোধিক চলকের (variables) মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধরণের সম্পর্ক যেখানে এক চলকের পরিবর্তনের ফলে অন্য চলকেরও নির্দিষ্ট পরিবর্তন ঘটে। এই সম্পর্ক গাণিতিকভাবে নির্ধারিত হয়। ভেদ প্রধানত তিন প্রকার — সরাসরি ভেদ, বিপরীত ভেদ ও যৌগিক ভেদ।
২. সরাসরি ভেদ (Direct Variation)
২.১ সংজ্ঞা:
যখন একটি চলক (x) বাড়ে এবং অপর চলক (y) অনুপাতে বাড়ে, তখন তাকে সরাসরি ভেদ বলে। অর্থাৎ,
y ∝ x বা y = kx, যেখানে k হলো একটি ধ্রুবক (constant of variation)।
২.২ বৈশিষ্ট্য:
- x ও y একসঙ্গে বাড়ে বা কমে
- y / x = ধ্রুবক
- সরলরেখার গ্রাফ তৈরি হয়
২.৩ উদাহরণ:
ধরা যাক একটি গাড়ি প্রতি ঘণ্টায় ৫০ কিমি বেগে চলে। সময় যত বাড়বে, দূরত্বও তত বাড়বে।
যদি সময় ২ ঘণ্টা হয়, দূরত্ব = ৫০ × ২ = ১০০ কিমি
সময় ৩ ঘণ্টা হলে, দূরত্ব = ৫০ × ৩ = ১৫০ কিমি
এখানে সময় ও দূরত্বের মধ্যে সরাসরি ভেদ আছে।
৩. বিপরীত ভেদ (Inverse Variation)
৩.১ সংজ্ঞা:
যখন একটি চলক বাড়ে এবং অপর চলক অনুপাতে কমে, তখন তাকে বিপরীত ভেদ বলে। অর্থাৎ,
y ∝ 1/x বা y = k/x
৩.২ বৈশিষ্ট্য:
- x বাড়লে y কমে
- x × y = ধ্রুবক
- ঘন বক্ররেখার মতো গ্রাফ তৈরি হয়
৩.৩ উদাহরণ:
একটি নির্দিষ্ট কাজ ৪ জন কর্মী ৬ দিনে শেষ করে।
যদি কর্মী সংখ্যা ৮ জন করা হয়, তবে সময় হবে ৩ দিন (কারণ ৪ × ৬ = ৮ × ৩ = ২৪)
এখানে কর্মী সংখ্যা ও কাজের সময়ের মধ্যে বিপরীত ভেদ আছে।
৪. যৌগিক ভেদ (Joint Variation)
৪.১ সংজ্ঞা:
যখন একটি চলক একাধিক চলকের সঙ্গে সরাসরি ও/বা বিপরীতভাবে সম্পর্কিত হয়, তখন তাকে যৌগিক ভেদ বলে।
উদাহরণ: y ∝ xz বা y = kxz
৪.২ বৈশিষ্ট্য:
- দুটি বা ততোধিক চলক নিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করে
- বিভিন্ন প্রকার ভেদের সম্মিলন
- ব্যবহারিক সমস্যায় বেশি ব্যবহৃত হয়
৪.৩ উদাহরণ:
ধরা যাক, কোনো কাজ সময় ও কর্মীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে।
সময় ∝ 1/(কর্মী সংখ্যা × দক্ষতা)
এই সম্পর্কটি যৌগিক ভেদের একটি উদাহরণ।
৫. গাণিতিক সমাধানের ধাপসমূহ
৫.১ ধ্রুবক নির্ণয় (Finding Constant):
প্রথমে দুটি চলকের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে ধ্রুবক k নির্ণয় করতে হয়।
উদাহরণ: যদি y ∝ x এবং y = 10 যখন x = 2, তাহলে
10 = k × 2 ⟹ k = 5
তাহলে y = 5x
৫.২ মান নির্ণয়:
পূর্ব নির্ধারিত k ব্যবহার করে অন্য চলকের মান নির্ণয় করা হয়।
উদাহরণ: আগের y = 5x সম্পর্ক থেকে, যদি x = 4 হয়,
তবে y = 5 × 4 = ২০
৬. ইউনিটের গুরুত্ব ও রূপান্তর
ভেদের প্রশ্নে ইউনিট সঠিকভাবে ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়, দূরত্ব, কাজ ইত্যাদি এককে প্রকাশ করতে হবে এবং প্রয়োজনে রূপান্তর করতে হবে।
উদাহরণ: ঘণ্টাকে মিনিটে রূপান্তর করতে ×৬০ করতে হবে।
৭. বাস্তব জীবনে ভেদের প্রয়োগ
ভেদের ধারণাগুলি শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তব জীবনে এর বহুল ব্যবহার রয়েছে।
৭.১ আর্থিক লেনদেন:
মূল্য ও পরিমাণের মধ্যে সরাসরি ভেদ (যত বেশি পণ্য, তত বেশি খরচ)
৭.২ গাড়ির গতি ও সময়:
গতি ও সময়ের মধ্যে বিপরীত ভেদ (গতি যত বেশি, সময় তত কম)
৭.৩ কাজ ও কর্মী সংখ্যা:
কাজের সময়, কর্মী সংখ্যা ও দক্ষতার যৌগিক ভেদ
৮. পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ ও গ্রাফ
৮.১ সরাসরি ভেদের গ্রাফ:
গ্রাফে একটি সরলরেখা উৎপত্তি বিন্দু থেকে উঠে যায় (Positive slope)
৮.২ বিপরীত ভেদের গ্রাফ:
একটি হাইপারবোলা আকারে গ্রাফ তৈরি হয়
৮.৩ বিশ্লেষণের গুরুত্ব:
গ্রাফের মাধ্যমে ভেদের প্রকৃতি সহজে চিহ্নিত করা যায় এবং চলকের পরিবর্তনের হার নির্ধারণ করা যায়।
৯. সংক্ষিপ্তসার
ভেদ অধ্যায়ে চলকের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণ করা হয় যা গণিতের বহু সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয়।
- সরাসরি ভেদ: এক চলক বাড়লে অন্যটিও বাড়ে
- বিপরীত ভেদ: এক চলক বাড়লে অন্যটি কমে
- যৌগিক ভেদ: একাধিক চলকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন