সভা-সমিতির যুগ’: বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

বিষয়বস্তু: উনিশ শতকে বাংলায় বিভিন্ন সভা ও সমিতির গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। এই সময়কালকে ‘সভা-সমিতির যুগ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ভারতে রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংগঠিত জনজীবনের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়কে চিহ্নিত করে। এই আলোচনায় এই যুগের বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ এবং বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, জমিদার সভা, ভারত সভা ও হিন্দুমেলা – এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।

‘সভা-সমিতির যুগ’-এর বৈশিষ্ট্য ও বিশ্লেষণ

উনিশ শতকের বাংলায় ‘সভা-সমিতির যুগ’ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দ্বারা চিহ্নিত:

  • সংগঠিত জনজীবনের উন্মেষ: এই সময়ে স্থানীয় ও প্রায়শই স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের পরিবর্তে আরও সংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী সম্মিলিত পদক্ষেপের সূচনা হয়। সভা ও সমিতিগুলি জনসমস্যা নিয়ে আলোচনা, grievances প্রকাশ এবং দাবি গঠনের জন্য মঞ্চ প্রদান করে।
  • রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ: এই সমিতিগুলির কার্যকলাপ শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলি জাতীয়তাবাদী ধারণা এবং ঔপনিবেশিক নীতির সমালোচনার বিকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে।
  • পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব: পাশ্চাত্য শিক্ষা এই সমিতিগুলির সদস্যদের আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা, উদারনীতির ধারণা এবং সংগঠন ও advocacy-র নীতি সম্পর্কে জ্ঞানার্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
  • বিভিন্ন সদস্যপদ ও উদ্দেশ্য: সমিতিগুলি তাদের সদস্যপদ ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে ভিন্ন ছিল। কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করত (যেমন জমিদার সভা), আবার কিছু বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্য রাখত (যেমন ভারত সভা)।
  • পরামর্শের পদ্ধতি: এই সমিতিগুলি তাদের উদ্বেগের কথা জানাতে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করত, যার মধ্যে সরকারের কাছে পিটিশন জমা দেওয়া, জনসভা আয়োজন করা, জার্নাল ও প্যামফলেট প্রকাশ করা এবং বিতর্ক ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
  • জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন: ‘সভা-সমিতির যুগ’ পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিকাশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। এই সময়ে অর্জিত সংগঠন, রাজনৈতিক mobilization এবং advocacy-র দক্ষতা স্বাধীনতা সংগ্রামের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে অমূল্য প্রমাণিত হয়েছিল।
  • ঔপনিবেশিক নীতির প্রতিক্রিয়া: এই সমিতিগুলির অনেকগুলি নির্দিষ্ট ঔপনিবেশিক নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া হিসেবে গঠিত হয়েছিল, যা ভারতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হয়েছিল।
  • সীমিত কিন্তু ক্রমবর্ধমান বিস্তার: প্রাথমিকভাবে শহুরে শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এই সমিতিগুলির প্রভাব ও ধারণা ধীরে ধীরে সমাজের বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

‘সভা-সমিতির যুগ’-এর চারটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ

১. বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা

  • প্রেক্ষাপট: ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা ছিল বাংলার প্রথম দিকের রাজনৈতিক সমিতিগুলির মধ্যে একটি। এটি এমন এক সময়ে গঠিত হয়েছিল যখন শিক্ষার মাধ্যম এবং বাংলা ভাষার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক ক্রমশ বাড়ছিল।
  • উদ্দেশ্য: প্রাথমিকভাবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়ন ও প্রচারের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেও, সভাটি বাংলার বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলি নিয়েও আলোচনা করত। এর লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার একটি মঞ্চ তৈরি করা এবং জনস্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়গুলিতে বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করা।
  • গুরুত্ব: বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, যদিও সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক ছিল না, বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান এবং একটি সাংস্কৃতিক পরিচিতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এটি বাংলা জনমতের বিকাশে অবদান রাখে এবং আরও স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক সংগঠনগুলির ভিত্তি স্থাপন করে। বাংলা ভাষার উপর এর জোর আঞ্চলিক চেতনার বিকাশের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছিল, যা পরবর্তীকালে জাতীয়তাবাদী ভাবনার জন্ম দিয়েছিল।

২. জমিদার সভা

  • প্রেক্ষাপট: ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জমিদার সভা, যা ল্যান্ডহোল্ডার্স’ অ্যাসোসিয়েশন নামেও পরিচিত, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সংগঠিত রাজনৈতিক সমিতি ছিল। এটি মূলত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ভূস্বামী অভিজাত শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করত।
  • উদ্দেশ্য: জমিদার সভার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জমিদারদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা। তারা তাদের ভূমি অধিকারের পরিপন্থী নীতিগুলির বিরোধিতা করত এবং তাদের অনুকূলে সরকারি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও রাজস্ব নীতির মতো বিষয়গুলি তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল।
  • গুরুত্ব: জমিদার সভা ভারতে সংগঠিত রাজনৈতিক কার্যকলাপের সূচনা করে, যদিও এটি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করত। এটি ঔপনিবেশিক সরকারের কাছে তাদের দাবি পেশ করার জন্য ভারতীয়দের সমিতি গঠনের সম্ভাবনা প্রদর্শন করে। এর লক্ষ্য সংকীর্ণ হলেও, এটি বৃহত্তর এজেন্ডা সহ ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংগঠনগুলির জন্য একটি মডেল প্রদান করে। এটি ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন অংশ এবং ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মধ্যে জটিল সম্পর্ককেও তুলে ধরে।

৩. ভারত সভা

  • প্রেক্ষাপট: ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ভারত সভা উনিশ শতকের ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠন ছিল। এর লক্ষ্য ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলিতে জনমত গঠন করা।
  • উদ্দেশ্য: ভারত সভার উদ্দেশ্য তার পূর্বসূরিদের তুলনায় ব্যাপক ছিল। এটি প্রশাসনে ভারতীয়দের বৃহত্তর অংশগ্রহণ, সিভিল সার্ভিস সংস্কার, শিক্ষার বিস্তার এবং জাতীয় ঐক্যের প্রচারের পক্ষে কথা বলত। এটি একটি সাধারণ রাজনৈতিক মঞ্চে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও প্রদেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিল।
  • গুরুত্ব: ভারত সভাকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি বিভিন্ন ইস্যুতে জনমত গঠনে, বৃহৎ আকারের সভা ও বিক্ষোভ আয়োজনে এবং শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের চেতনা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সমাজের বৃহত্তর অংশের প্রতিনিধিত্ব এবং এর আরও স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক এজেন্ডা ভারতে সংগঠিত রাজনৈতিক কার্যকলাপের বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ চিহ্নিত করে।

৪. হিন্দুমেলা

  • প্রেক্ষাপট: হিন্দুমেলা, যা জাতীয় মেলা নামেও পরিচিত, ১৮৬৭ সালে নবগোপাল মিত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রাজনারায়ণ বসুর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমর্থনে শুরু করেছিলেন। এটি জাতীয় চেতনা, আত্মনির্ভরতা এবং দেশীয় শিল্প ও কারুশিল্পের পুনরুজ্জীবনকে উৎসাহিত করার জন্য একটি মঞ্চ হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছিল।
  • উদ্দেশ্য: হিন্দু মেলার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম জাগানো, দেশীয় শিল্প ও দক্ষতার বিকাশকে উৎসাহিত করা এবং একটি shared সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। আপাতদৃষ্টিতে সাংস্কৃতিক হলেও, এর মধ্যে আত্মনির্ভরতা ও ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক বার্তা ছিল।
  • গুরুত্ব: হিন্দুমেলা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক প্রকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, যদিও একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মঞ্চের মাধ্যমে। এটি জাতীয় sentiments প্রকাশ, দেশীয় সংস্কৃতির প্রচার এবং একটি সম্মিলিত পরিচিতি গড়ে তোলার জন্য একটি স্থান প্রদান করে। আত্মনির্ভরতা ও জাতীয় গর্বের উপর এর জোর বাংলায় বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী জাগরণে অবদান রাখে। এর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব ভারত সভার তুলনায় কম হতে পারে, তবে এটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

উনিশ শতকের বাংলায় ‘সভা-সমিতির যুগ’ ছিল একটি রূপান্তরকারী সময়কাল যা সংগঠিত রাজনৈতিক কার্যকলাপের ধীরে ধীরে উত্থান এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক উন্মেষের সাক্ষী ছিল। বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, জমিদার সভা, ভারত সভা ও হিন্দুমেলা, প্রত্যেকেই তাদের স্বতন্ত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে, সম্মিলিতভাবে এই বিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অবদান রেখেছিল। তারা grievances প্রকাশের, রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির এবং জনমত গঠনের জন্য মঞ্চ প্রদান করে, যা ঔপনিবেশিক শাসনের পরবর্তী দশকগুলিতে আরও সংগঠিত ও ব্যাপক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে। এই উদ্যোগগুলি ভারতীয়দের তাদের অধিকার সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা এবং তাদের নিজস্ব ভাগ্য গঠনে সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

 

Scroll to Top