বিষয়বস্তু: ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। উত্তর ভারতে ব্যাপক বিদ্রোহের দ্বারা চিহ্নিত এই ঘটনাটি এর চরিত্র এবং ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদের ধারণার সাথে এর সম্পর্ক নিয়ে উল্লেখযোগ্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই আলোচনায় এই দিকগুলি সংক্ষেপে তুলে ধরা হবে, বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব এবং ১৮৫৮ সালের মহারানির ঘোষণাপত্রের তাৎপর্য আলোচনা করা হবে।
১৮৫৭-এর বিদ্রোহ: চরিত্র ও প্রকৃতি
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ, যা সিপাহী বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ নামেও পরিচিত, একটি জটিল ঘটনা যার বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল:
- সামরিক উৎপত্তি: বিদ্রোহের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজগুলিতে গ্রীস লাগানো নিয়ে বিতর্ক, যা হিন্দু ও মুসলিম সিপাহীদের (সৈন্য) কাছে আপত্তিকর পশুর চর্বি দিয়ে তৈরি বলে গুজব রটেছিল। এর ফলে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়।
- ব্যাপক অংশগ্রহণ: বিদ্রোহ দ্রুত তার সামরিক উৎস ছাড়িয়ে যায় এবং বিভিন্ন স্তরের ভারতীয় সমাজকে আকৃষ্ট করে, যার মধ্যে অসন্তুষ্ট শাসক (যেমন নানা সাহেব, রাণী লক্ষ্মীবাঈ এবং বাহাদুর শাহ জাফর), জমিদার, কৃষক ও কারিগররা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে grievances, যেমন ভূমি রাজস্ব বন্দোবস্ত, দেশীয় রাজ্যগুলির অধিগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক শোষণ, এই ব্যাপক অংশগ্রহণের ইন্ধন জুগিয়েছিল।
- বিভিন্ন উদ্দেশ্য: বিদ্রোহের পেছনের উদ্দেশ্যগুলি বিভিন্ন ছিল। সিপাহীরা ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং খারাপ চাকরির অবস্থার প্রতিবাদ করেছিল। শাসকরা তাদের হারানো রাজ্য ও কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করেছিলেন। কৃষক ও জমিদাররা নিপীড়নমূলক ভূমি নীতি ও অর্থনৈতিক কষ্টের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
- স্থানীয় প্রভাব: উত্তর ভারতে ব্যাপক হলেও, বিদ্রোহের তীব্রতা ও প্রভাব আঞ্চলিকভাবে ভিন্ন ছিল। কিছু অঞ্চলে তীব্র লড়াই দেখা যায়, আবার কিছু অঞ্চল তুলনামূলকভাবে অক্ষত ছিল।
- ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব ও আদর্শের অভাব: বিদ্রোহে কোনো কেন্দ্রীয় ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব এবং একটি সুসংহত সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদী আদর্শের অভাব ছিল। জড়িত বিভিন্ন নেতা ও গোষ্ঠীর নিজস্ব নির্দিষ্ট grievances ও উদ্দেশ্য ছিল।
- নির্মম দমন: ব্রিটিশরা বিদ্রোহের কঠোরভাবে দমন করে, যার ফলে উভয় পক্ষেই ব্যাপক সহিংসতা ও প্রাণহানি ঘটে। বিদ্রোহের দমন ব্রিটিশ শাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ছিল, যা নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং নীতিতে পরিবর্তনের দিকে পরিচালিত করে।
বিদ্রোহের সঙ্গে জাতীয়তাবোধের সম্বন্ধবিষয়ক বিতর্ক
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রকৃতি এবং জাতীয়তাবাদের ধারণার সাথে এর সংযোগ ঐতিহাসিকদের মধ্যে তীব্র বিতর্কের বিষয়:
- প্রাথমিক জাতীয়তাবাদী অভ্যুত্থান: কিছু ঐতিহাসিক ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রথম প্রধান অভিব্যক্তি হিসেবে দেখেন। তারা ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজন নির্বিশেষে ব্যাপক অংশগ্রহণ, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সাধারণ আকাঙ্ক্ষা এবং একটি ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় অতীতের আহ্বানের দিকে ইঙ্গিত করেন। রাণী লক্ষ্মীবাঈ ও বাহাদুর শাহ জাফরের মতো ব্যক্তিত্বকে প্রাথমিক জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
- স্থানীয় grievances ও ঐতিহ্যবাহী আনুগত্য: অন্যান্য ঐতিহাসিকরা যুক্তি দেন যে বিদ্রোহ মূলত স্থানীয় grievances এবং ঐতিহ্যবাহী আনুগত্য দ্বারা চালিত হয়েছিল, সম্পূর্ণরূপে বিকশিত জাতীয়তাবাদী চেতনা দ্বারা নয়। তারা অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন উদ্দেশ্য, একটি ঐক্যবদ্ধ সর্বভারতীয় আদর্শের অভাব এবং ব্রিটিশ-পরবর্তী ভারতের জন্য একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির অনুপস্থিতির উপর জোর দেন। তারা যুক্তি দেন যে বিদ্রোহীদের প্রাথমিক আনুগত্য প্রায়শই তাদের স্থানীয় শাসক, সম্প্রদায় বা ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতি ছিল।
- প্রাক-জাতীয়তাবাদ: একটি আরও সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্তাব করে যে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ প্রাক-জাতীয়তাবাদের একটি রূপের প্রতিনিধিত্ব করে। যদিও এটি তখনও সম্পূর্ণরূপেarticulated জাতীয়তাবাদী আদর্শ ছিল না, একটি সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভাগ করা অভিজ্ঞতা এবং ঐক্যের অভিব্যক্তি (যদিও সীমিত) পরবর্তীকালে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশের জন্য কিছু ভিত্তি স্থাপন করেছিল।
১৮৫৭-র বিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রতি শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মনোভাব মূলত দ্বিধাগ্রস্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে বিদ্রোহের সমালোচনামূলক ছিল। এই অবস্থানের জন্য বেশ কয়েকটি কারণ দায়ী:
- পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব: শিক্ষিত বাঙালি অভিজাত শ্রেণী পাশ্চাত্য শিক্ষাকে গ্রহণ করেছিল এবং প্রায়শই এটিকে সামাজিক অগ্রগতি ও আধুনিকীকরণের বাহন হিসেবে দেখত। তারা সাধারণভাবে ব্রিটিশদের প্রবর্তিত কিছু সংস্কারের (যেমন সতীদাহ নিবারণ) প্রশংসা করত।
- ধীরে ধীরে সংস্কারে বিশ্বাস: অনেকেই মনে করতেন যে সহিংস উত্থানের পরিবর্তে ধীরে ধীরে সংস্কার ও ব্রিটিশদের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। তারা ব্যাপক বিদ্রোহের ফলে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতাকে ভয় পেতেন।
- সিপাহী ও ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থার থেকে দূরত্ব: শিক্ষিত বাঙালিরা প্রায়শই সিপাহীদের থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব অনুভব করতেন, যারা মূলত গ্রামীণ পটভূমি থেকে উঠে এসেছিলেন এবং একটি আরও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করতেন। তারা বিদ্রোহকে কুসংস্কার ও পুরনো grievances দ্বারা চালিত একটি পশ্চাৎপদ আন্দোলন হিসেবে দেখতেন।
- সামাজিক বিশৃঙ্খলার ভয়: শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণী, যারা প্রায়শই উচ্চবর্ণের ছিলেন, ঐতিহ্যবাহী উপাদানদের নেতৃত্বে একটি সফল বিদ্রোহের ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা করতেন। তারা পুরনো ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন।
- ব্রিটিশ রাজের প্রতি আনুগত্য (কিছু ক্ষেত্রে): কিছু শিক্ষিত বাঙালি বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশ শাসন, ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও, স্থিতিশীলতা ও উন্নতির সুযোগ প্রদান করে। তারা ব্রিটিশ রাজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন এবং বিদ্রোহের সহিংসতার নিন্দা করেছিলেন।
- বিদ্রোহীদের কার্যকলাপের সমালোচনা: বাঙালি সংবাদপত্র ও বুদ্ধিজীবীরা প্রায়শই বিদ্রোহীদের সহিংসতা ও স্পষ্ট লক্ষ্যের অভাবের সমালোচনা করতেন। তারা বিদ্রোহকে অসংগঠিত এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে বাধ্য বলে মনে করতেন।
তবে, এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে শিক্ষিত বাঙালি সমাজের মধ্যে কিছু ভিন্নমত পোষণকারী কণ্ঠস্বরও ছিল যারা বিদ্রোহীদের grievances-এর প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছিল এবং বিদ্রোহকে ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি বৈধ অভিব্যক্তি হিসেবে দেখেছিল। তবুও, প্রভাবশালী অনুভূতি ছিল সতর্ক নিরপেক্ষতা বা এমনকি প্রকাশ্য অপছন্দ।
মহারানির ঘোষণাপত্র (১৮৫৮)
১৮৫৮ সালের নভেম্বরে রাণী ভিক্টোরিয়া কর্তৃক জারিকৃত মহারানির ঘোষণাপত্র ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া ছিল এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চিহ্নিত করেছিল। ঘোষণাপত্রের মূল দিকগুলি ছিল:
- ক্ষমতা হস্তান্তর: ঘোষণাপত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান এবং ব্রিটিশ রাজের সরাসরি ভারত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা করা হয়।
- ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি: রাণী ভারতীয় জনগণকে আশ্বস্ত করেন যে ব্রিটিশ সরকার তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না। এটি বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণের সরাসরি প্রতিক্রিয়া ছিল।
- আইনের অধীনে সমান সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি: ঘোষণাপত্রে জাতি বা ধর্ম নির্বিশেষে সকল প্রজাকে আইনের অধীনে সমান সুরক্ষা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
- ভারতীয় রাজন্যবর্গের সাথে চুক্তির প্রতি সম্মান: ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় দেশীয় রাজ্যগুলির সাথে সম্পাদিত চুক্তি ও চুক্তিগুলি মেনে চলার অঙ্গীকার করে।
- প্রশাসনে ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্তি: ঘোষণাপত্রে যোগ্য ভারতীয়দের প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়, যদিও এটি ধীরে ধীরে এবং সীমিতভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল।
- সাধারণ ক্ষমা: ব্রিটিশ প্রজাদের হত্যার সাথে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের ব্যতীত বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী সকলের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়।
তাৎপর্য: মহারানির ঘোষণাপত্রের লক্ষ্য ছিল বিদ্রোহের পর ভারতীয় জনগণকে শান্ত করা এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করা। এটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রায়শই স্বেচ্ছাচারী শাসন থেকে ব্রিটিশ রাজের অধীনে আরও প্রত্যক্ষ এবং আপাতদৃষ্টিতে কল্যাণকর শাসনের দিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। যদিও অনেক প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি, ঘোষণাপত্র ভারতে ভবিষ্যতের ব্রিটিশ নীতির সুর নির্ধারণ করে এবং বিদ্রোহের কারণ হওয়া কিছু grievances সমাধানের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ রাজের শুরুও চিহ্নিত করে।