ভূমিকা
বংশগতি (Heredity) হল সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বাবা-মায়ের বৈশিষ্ট্য সন্তানের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। গ্রেগর মেন্ডেল, যিনি “জেনেটিক্সের জনক” নামে পরিচিত, মটর গাছের উপর গবেষণা করে বংশগতির মৌলিক সূত্র আবিষ্কার করেন। পরবর্তী সময়ে, অন্যান্য প্রাণীর ওপরও এই সূত্রগুলি প্রযোজ্য কিনা তা পরীক্ষা করা হয়। গিনিপিগের ওপর করা ডাইহাইব্রিড ক্রস পরীক্ষা এই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গিনিপিগে মেন্ডেলের ডাইহাইব্রিড ক্রস পরীক্ষা
ডাইহাইব্রিড ক্রস হল এমন একটি জিনগত পরীক্ষা যেখানে একসাথে দুটি বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার অধ্যয়ন করা হয়। মেন্ডেল মটর গাছ নিয়ে এই পরীক্ষা করেছিলেন, কিন্তু একই ধরনের গবেষণা গিনিপিগের উপরও করা হয়।
গিনিপিগের বৈশিষ্ট্য (Traits) যা পরীক্ষা করা হয়েছিল
ডাইহাইব্রিড ক্রসের জন্য দুটি বিপরীত বৈশিষ্ট্য বেছে নেওয়া হয়:
- কোটের রঙ (Coat Color):
- কালো (Black) – প্রভাবশালী (Dominant) – B
- সাদা (White) – প্রত্যাশী (Recessive) – b
- কোটের ধরন (Coat Texture):
- রুক্ষ (Rough) – প্রভাবশালী (Dominant) – R
- মসৃণ (Smooth) – প্রত্যাশী (Recessive) – r
এই পরীক্ষা প্রাধান্য (Dominance), বিভাজন (Segregation) এবং স্বাধীন বিন্যাসের (Independent Assortment) সূত্র অনুসারে বংশগতির ধরন নির্ধারণ করতে সাহায্য করে।
ডাইহাইব্রিড ক্রসের ধাপসমূহ
ধাপ ১: মূল অভিভাবক নির্বাচন (P Generation)
- দুটি বিশুদ্ধ জাতের গিনিপিগ নির্বাচন করা হয়:
- কালো, রুক্ষ কোটযুক্ত গিনিপিগ (BBRR)
- সাদা, মসৃণ কোটযুক্ত গিনিপিগ (bbrr)
- এই দুটি গিনিপিগকে পরস্পরের সাথে সংকরিত (Cross) করা হয়।
ধাপ ২: প্রথম প্রজন্মের সৃষ্টি (F₁ Generation)
- এই সংকরায়নের ফলে প্রথম প্রজন্মে (F₁) সমস্ত গিনিপিগ কালো ও রুক্ষ কোটযুক্ত (BbRr) হয়, কারণ প্রভাবশালী জিন (B এবং R) প্রত্যাশী জিনগুলোর (b এবং r) উপর আধিপত্য বিস্তার করে।
ধাপ ৩: দ্বিতীয় প্রজন্মের সৃষ্টি (F₂ Generation)
- প্রথম প্রজন্মের গিনিপিগদের নিজেদের মধ্যে সংকরায়ন করা হয়:
- BbRr × BbRr
ধাপ ৪: দ্বিতীয় প্রজন্মের ফলাফল
F₂ প্রজন্মের সম্ভাব্য জিনোটাইপ (Genotype) নির্ধারণের জন্য পানেট স্কোয়ার (Punnett Square) ব্যবহার করা হয়:
| গ্যামেট (Gametes) | BR | Br | bR | br |
| BR | BBRR (কালো, রুক্ষ) | BBRr (কালো, রুক্ষ) | BbRR (কালো, রুক্ষ) | BbRr (কালো, রুক্ষ) |
| Br | BBRr (কালো, রুক্ষ) | BBrr (কালো, মসৃণ) | BbRr (কালো, রুক্ষ) | Bbrr (কালো, মসৃণ) |
| bR | BbRR (কালো, রুক্ষ) | BbRr (কালো, রুক্ষ) | bbRR (সাদা, রুক্ষ) | bbRr (সাদা, রুক্ষ) |
| br | BbRr (কালো, রুক্ষ) | Bbrr (কালো, মসৃণ) | bbRr (সাদা, রুক্ষ) | bbrr (সাদা, মসৃণ) |
ধাপ ৫: F₂ প্রজন্মের স্বতন্ত্র অনুপাত (Phenotypic Ratio)
F₂ প্রজন্মের মধ্যে চার ধরনের বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়:
- ৯টি কালো, রুক্ষ কোটযুক্ত (BBRR, BBRr, BbRR, BbRr)
- ৩টি কালো, মসৃণ কোটযুক্ত (BBrr, Bbrr)
- ৩টি সাদা, রুক্ষ কোটযুক্ত (bbRR, bbRr)
- ১টি সাদা, মসৃণ কোটযুক্ত (bbrr)
এটি ৯:৩:৩:১ অনুপাত সৃষ্টি করে, যা মেন্ডেলের স্বাধীন বিন্যাসের সূত্র (Law of Independent Assortment) নিশ্চিত করে।
মেন্ডেলের বংশগতির তিনটি সূত্র
১. প্রাধান্যের সূত্র (Law of Dominance)
- সংকরিত জীবের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয় এবং প্রত্যাশী বৈশিষ্ট্য গোপন থাকে।
- উদাহরণ: F₁ প্রজন্মে সব গিনিপিগ কালো (Bb) হয়, কারণ কালো রঙ প্রভাবশালী।
২. বিভাজনের সূত্র (Law of Segregation)
- গ্যামেট গঠনের সময় প্রত্যেক বৈশিষ্ট্যের দুটি অ্যালিল (Allele) আলাদা হয়ে যায় এবং প্রতিটি গ্যামেট শুধুমাত্র একটি অ্যালিল বহন করে।
- উদাহরণ: F₂ প্রজন্মে কিছু গিনিপিগ সাদা (bb) হয়, কারণ তারা দুটি প্রত্যাশী অ্যালিল পেয়েছে।
৩. স্বাধীন বিন্যাসের সূত্র (Law of Independent Assortment)
- এক বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার অন্য বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে না।
- উদাহরণ: গিনিপিগের কোটের রঙ এবং কোটের ধরন একে অপরের থেকে আলাদাভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যায়, যার ফলে ৯:৩:৩:১ অনুপাত তৈরি হয়।
গিনিপিগের উপর করা ডাইহাইব্রিড ক্রস পরীক্ষা প্রমাণ করে যে বৈশিষ্ট্য উত্তরাধিকারের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে যায়। মেন্ডেলের এই গবেষণা আধুনিক জেনেটিক্সের ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং বংশগতির বিভিন্ন দিক বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করেছে। ডাইহাইব্রিড ক্রসে পাওয়া ৯:৩:৩:১ অনুপাত এখনও জেনেটিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।