বৈচিত্র্যতা এবং তার সংরক্ষণ: জীববৈচিত্র্য হ্রাস ও তার কারণ

ভূমিকা

জীববৈচিত্র্য হল পৃথিবীর বিভিন্ন জীবের সমষ্টি, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে, আধুনিক কালে মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের ফলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে পরিবেশের স্বাভাবিক গঠন ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এই অধ্যায়ে আমরা জীববৈচিত্র্য হ্রাসের প্রধান কারণসমূহ আলোচনা করব।

জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণ

১. আবাসস্থল ধ্বংস (Destruction of Habitat)

জীবজন্তু ও উদ্ভিদের টিকে থাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট বাসস্থান প্রয়োজন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান নগরায়ন, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের ফলে প্রাকৃতিক বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। এতে অনেক প্রজাতির আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে, যা তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।

২. শিকার এবং পাচার (Hunting and Poaching)

বন্যপ্রাণীর চামড়া, দাঁত, শিং, মাংস ও হাড়ের চাহিদার কারণে নির্বিচারে শিকার করা হয়। বিশেষত, বাঘ, গন্ডার, হাতি এবং হরিণের মতো প্রাণীদের শিকার ও পাচার করা হয়, যা তাদের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস করছে এবং অনেক প্রজাতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

৩. বন উজাড় (Deforestation)

মানবসভ্যতার বিকাশের জন্য বনাঞ্চল ধ্বংস করা হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বন ধ্বংসের ফলে শুধু যে গাছপালার ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, বরং সেখানে বসবাসকারী প্রাণী ও ক্ষুদ্র জীবদের অস্তিত্বও বিপন্ন হচ্ছে। এর ফলে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং জলবায়ুর পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে।

৪. দূষণ (Pollution)

বায়ুদূষণ, জলদূষণ, ভূমিদূষণ এবং শব্দদূষণ জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। শিল্প কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস, প্লাস্টিক বর্জ্য, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার এবং তেল নিঃসরণ জলজ প্রাণীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

৫. অতিরিক্ত আহরণ (Over Exploitation)

মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করছে। অতিরিক্ত বৃক্ষছেদন, অতিরিক্ত মাছ ধরা, জলস্তর থেকে অধিক পানি উত্তোলন, জমির অত্যধিক ব্যবহার ইত্যাদি বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করছে।

৬. প্রাকৃতিক দুর্যোগ (Natural Calamities)

ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, সুনামি, দাবানল, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। বিশেষ করে, দাবানল এবং সুনামির কারণে ব্যাপকভাবে গাছপালা ধ্বংস হয় এবং অনেক বন্যপ্রাণী মৃত্যুবরণ করে।

৭. বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন (Global Warming and Climate Change)

গ্রীনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে বিশ্বের উষ্ণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তাপমাত্রার পরিবর্তনের ফলে অনেক প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ তাদের স্বাভাবিক জীবনধারা বজায় রাখতে পারছে না, যা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ।

৮. বহিরাগত প্রজাতির অনুপ্রবেশ (Introduction of Exotic Species)

একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বহিরাগত বা বিদেশি প্রজাতির প্রাণী বা উদ্ভিদ প্রবেশ করলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই প্রজাতিগুলো স্থানীয় জীবগুলোর খাদ্য ও বাসস্থানের প্রতিযোগী হয়ে ওঠে এবং অনেক সময় স্থানীয় প্রজাতিগুলোর বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, জলজ বাস্তুতন্ত্রে জলজ আগাছা যেমন হায়াসিন্থ মাছ ও অন্যান্য প্রাণীদের জীবনচক্রকে ব্যাহত করে।

 

জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। অবাধ বন উজাড়, দূষণ, শিকার ও প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত আহরণ বন্ধ করে আমরা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি প্রতিরোধ করতে পারি। পাশাপাশি, সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হ্রাস করা সম্ভব। যদি আমরা এখনই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করি, তবে ভবিষ্যতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে, যা মানবসভ্যতার জন্যও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

 

Scroll to Top